জ্বালানিসংকট মোকাবিলা করে পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে হবে

| রবিবার , ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

তীব্র জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ায় চাপে রয়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে দেশের বেশির ভাগ পোশাক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) নেতারা। একই সঙ্গে গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বলেও তাঁরা জানিয়েছেন। পাশাপাশি কর্মসংস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। গত বুধবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এসব তথ্য তুলে ধরে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান সংকট, রপ্তানি পরিস্থিতি, বিনিয়োগ এবং শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হয়।

বিজিএমইএ নেতারা বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি আদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও মজুরি সমন্বয়ের কারণে গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১.৬৪ শতাংশ কমেছে। চলতি ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও রপ্তানি কমেছে ১.৯২ শতাংশ। অন্যদিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএ নেতারা রাষ্ট্রপতিকে জানান, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক খাতের সংকট কাটিয়ে শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে রাষ্ট্রপতির কাছে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন বিজিএমইএ নেতারা। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গ্যাসসংকট মোকাবিলায় দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং এলএনজি আমদানির পর্যায়ে শুল্ককর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে স্বল্প সুদের বিশেষ ঋণ দেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।

অবকাঠামো ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকাচট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কার্গো শেড নির্মাণ এবং বেটার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর দাবি জানানো হয়। ব্যাংকিং খাতে চলতি মূলধন ও বাণিজ্য ঋণের সুদের হার কমানো, পোশাক খাতের জন্য বিশেষ ‘পোস্টশিপমেন্ট ফাইন্যান্সিং’ ব্যবস্থা চালু এবং জিটিএফ ও টিডিএফ তহবিলে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাবও দিয়েছে বিজিএমইএ।

ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে কাস্টমস বন্ড অডিট প্রক্রিয়া সহজ ও প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল দ্রুত আমদানির স্বার্থে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর দাবি জানানো হয়। এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বাজার ধরে রাখতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। বিজিএমইএ নেতাদের বক্তব্য সহানুভূতির সঙ্গে শোনেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি তৈরি পোশাক শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘মেরুদণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সাময়িক প্রতিকূলতা কাটিয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে পোশাকশিল্প দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে কারখানায় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ছে। আবার দীর্ঘ সময় ধরে চালু থাকার কারণে জেনারেটর বিকল হচ্ছে। এতে পোশাক উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দিনে আরও বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়; এটি কোটি মানুষের জীবিকার উৎস। তাই এই সংকট মোকাবেলায় দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তাঁরা বলেন, প্রথমত জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে কর্মহানি না ঘটে এবং শিল্পকারখানাগুলো সচল থাকে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বেশি কর্মহানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব এলাকাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁরা বলেন, তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে