দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ‘লাইফ লাইন’ খ্যাত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের যোগাযোগব্যবস্থা এখন বিপর্যন্ত। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ’। এতে বলা হয়েছে, প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা থাকলেও চলে ৩৫ থেকে ৪৬ হাজার গাড়ি, যা ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ। ফলে গাড়ির গতি সামান্য কমলেই বা কোথাও গাড়ি বিকল হলেই দেখা দিচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ যানজট। একই সঙ্গে সড়কের যত্রতত্র খানাখন্দ, অবৈধ স্ট্যান্ড, হাটবাজার, নিষিদ্ধ থ্রি–হুইলারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রতিনিয়ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে প্রায়ই থমকে যাচ্ছে চলাচল। অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অপরদিকে মহাসড়কের ওপর এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং ৯ লেনে উন্নীতকরণ নিয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কর্মযজ্ঞ চলায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিদিনই যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সড়কের পরিধি থাকছে আগের মতোই। সওজ ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সমীক্ষায় জানা যায়, মহাসড়কে প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশের বেশি নতুন যানবাহন যুক্ত হচ্ছে। তবে সেই অনুপাতে সড়কের ধারণক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এই মহাসড়কে দৈনিক যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে ৬৬ হাজারে পৌঁছাতে পারে এবং ২০৪০ সালে তা দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ১৯ হাজারে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চার বছরের মধ্যেই দেশের এই প্রধান মহাসড়কটি কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের অর্থনীতির গতি সচল রাখতে এবং বিশাল এই যানবাহনের চাপ সামাল দিতে এখনই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বিদ্যমান চার লেনের এই মহাসড়ককে দ্রুত ১০ লেনে উন্নীত করা না হলে পণ্য পরিবহণ ও যাতায়াতে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মহাসড়কের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনা কিংবা লেন সমপ্রসারণের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষা নিয়ে কাজ করছে সড়ক বিভাগ। তাছাড়া এই মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট মহাসড়কের দুর্ঘটনা ও যানজটের হটস্পট নিয়ে কাজ করছে। আর কারিগরি বিষয় ও লেনের সক্ষমতা বাড়াতে সমীক্ষা চালাচ্ছে সওজ এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়।
ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ১০ লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে একসময়ে জানিয়েছিলেন তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব। তিনি বলেছিলেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে করে ঢাকা থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে যাওয়া যাবে। এজন্য এই মহাসড়ক ১০ লেনে উন্নীত করা হবে। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক উন্নীত হবে ১০ লেইনে। আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও তা এখন যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। যানবাহনের অত্যধিক চাপ বেড়ে যাওয়ায় যানজটে পড়ে মহাসড়কটিতে প্রায়ই অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। মাইলের পর মাইল যানজট লেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ দেশের প্রধান দুই মহানগরী এবং অর্থনীতির শতকরা ৫০ ভাগ পরিচালনাকারী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা মসৃণ ও দ্রুত করার জন্যই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু এর সুফল মিলছে না। প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগ না হওয়ায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য পরিবহনে সময় ও অর্থ লাগছে বেশি। যানজটের কারণে হচ্ছে যাত্রী দুর্ভোগও।’
একজন নিয়মিত যাত্রীর অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয়েছে, এটি কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং এক মানসিক নিগ্রহের নাম। যারা কর্মস্থলের তাগিদে প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করেন, তাদের জীবনের একটি বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে এই অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট। সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বা সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার পথে যখন একজন মানুষ দুই–তিন ঘণ্টা যানজটে বসে থাকেন, তখন তার সৃজনশীলতা এবং কর্মস্পৃহা উভয়ই হ্রাস পায়। কুমিল্লার মতো একটি দূরত্ব থেকে যারা চট্টগ্রামে অফিস করতে আসেন, কুমিরা পার হওয়ার পর তাদের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা পুরো দিনের কর্মশক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। এটি কেবল একক ব্যক্তির ক্ষতি নয়, সামগ্রিকভাবে জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চট্টগ্রামের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থাটি ছয় বা আট লেনের করা উচিত ছিল। সেটা করা হয়নি, সরকারের উন্নয়ন–দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।







