সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে সরকারি চাকুরেদের জন্য নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। তাতে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। বিসিএস দিয়ে যারা প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা পদে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন তারা এ গ্রেডে বেতন পান। অপরদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার (নির্ধারিত) থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ গ্রেডে বেতন পান। সেই সঙ্গে বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা ও আর্থিক সুবিধা বাড়ানোরও অনুমোদন দেওয়া হয়।
সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য নতুন পে–স্কেল অনুমোদনের পর এটি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে কিংবা বাড়তি এই বিশাল অংকের অর্থের যোগান কিভাবে নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। একই সাথে পে–স্কেল নিয়ে সরকারি এই ঘোষণার পর দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়া অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের প্রভাবের আশঙ্কা করছেন অনেকে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এই পে–স্কেল চলতি বছরের পহেলা জুলাই থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে উৎপাদনখাতে স্থবিরতার পাশাপাশি রাজস্ব আহরণে দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ আয় সংগ্রহে দুর্বলতার মধ্যেই সরকার চাকরিজীবীদের সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে নবম জাতীয় বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে। এর ফলে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি কাটছাঁট করতে হতে পারে। পাশাপাশি চাপের মুখে পড়বে বেসরকারি খাতের মানুষ। অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সরকার আগামী এক বছরে পে স্কেল যেভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেছে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে ব্যাংক থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে এবং একই সাথে এমনিতেই সংকটের কারণে কম আসা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আরও কাটছাঁট করতে হতে পারে।
এদিকে, সরকারি কর্মজীবী ও তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়–ব্যয় ও সম্পদের হিসাব বাৎসরিকভাবে হালনাগাদ ও প্রকাশের শর্তে নতুন পে–স্কেল বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আর্থিক সক্ষমতার কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনটি ধাপে সরকারি কর্মজীবীদের নতুন পে–স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন–ভাতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা কঠিন। তবে জনগণের করের টাকায় বেতন–ভাতা বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে সরকারি কর্মজীবী ও তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, ‘যেসব কর্মজীবী তাদের আয়–ব্যয় ও সম্পদবিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদ করাসহ প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের জন্যই নতুন বেতন–ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যারা প্রকাশ করবেন না, তাদের জন্য নতুন পে–স্কেল প্রযোজ্য হওয়া অনুচিত।’ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এ শর্ত বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি খাতে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সেবার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশা বলছেন, জ্বালানির দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়া ও বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশ উৎপাদন খরচজনিত মূল্যস্ফীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সাথে বেতন স্কেলের একেবারে সরাসরি সম্পর্ক নেই। আবার রাজস্ব আহরণ কম হচ্ছে। কিন্তু বেতন ভাতা তো দিতে হবে। এছাড়া বাজারে পণ্য সরবরাহে কৃত্রিম সংকট কিংবা অর্থায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করবে। যা মূল্যস্ফীতি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, পে–স্কেলের কারণে বেসরকারি খাতের ওপর চাপ পড়বে এবং এই খাতে হতাশা তৈরি হবে। বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন ও সেবা খাতে চাপ পড়বে। সে কারণে সরকারকে বেসরকারি খাতেও সামঞ্জস্য আনতে হবে, বিশেষ করে উৎপাদন খরচ কমানো ও ব্যবসা সহজ করতে সহায়তা দিতে হবে যাতে তাদের উৎপাদন খরচ কমে আসে। এজন্য ইনসেন্টিভ দেওয়া যেতে পারে যাতে ধাপে ধাপে যাতে ব্যক্তিখাত বেতন বাড়াতে পারে। দাম বাড়ার কথা বলে মজুতদারি হবে। এগুলো যাতে না হতে পারে সেটি দেখতে হবে। বিদ্যুৎ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করে ব্যক্তিখাতকে স্বস্তি দিতে হবে। তারা যাতে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা এডজাস্ট করতে পারে। সরকারকেও তাদেরকে বোঝাতে হবে যে বেতন বাড়ানো সবার জন্য যৌক্তিক।








