আগামী একশ বছরের বন্দর হিসেবে বিবেচিত বে–টার্মিনালের ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রেকওয়াটারের নকশা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য কাজেও আনা হচ্ছে গতি। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি টার্মিনাল চালু করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগুচ্ছে।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, নগরীর হালিশহর উপকূলে আগামী একশ বছরের বন্দর হিসেবে বে টার্মিনাল গড়ে তোলার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নতুন নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, ইয়ার্ডসহ পশ্চাৎসুবিধা তৈরি করা হলেও আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দর দেশের চাহিদা মেটাতে পারবে না। এক্ষেত্রে নতুন বন্দর নির্মাণ খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা তিনগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। বে টার্মিনালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ব্রেকওয়াটারের কারিগরি নকশা চূড়ান্ত করা। এ জন্য দুই ধাপের সিমুলেশন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সিঙ্গাপুরে ব্রেকওয়াটারের কারিগরি মূল্যায়নের ২–ডি সিমুলেশন সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী ধাপের সিমুলেশন দক্ষিণ আফ্রিকায় করার কথা থাকলেও সময় বাঁচাতে সেটিও সিঙ্গাপুরেই করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ব্রেকওয়াটারের নকশা চূড়ান্ত হলেই প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। বে টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বব্যাংক বড় ধরনের অর্থায়ন করছে। ২০২৪ সালের জুনে বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ প্রকল্পটির জন্য ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুমোদন করে। এই অর্থে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ জলবায়ু–সহনশীল ব্রেকওয়াটার নির্মাণ, বন্দর বেসিন, প্রবেশপথ ও অ্যাক্সেস চ্যানেল ড্রেজিংসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
এর বাইরে টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালের দুটি কন্টেনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনায় সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের আলোচনা চলছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের একটি প্রতিষ্ঠান বে টার্মিনালে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা টার্মিনালটির অবকাঠামো নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় অংশ নিতে চায় বলে জানিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বে টার্মিনাল নিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সূত্র বলেছে, সরকার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মূল ব্রেকওয়াটার ও চ্যানেল ড্রেজিংয়ের মতো অবকাঠামো গড়ে তুলবে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা টার্মিনাল অবকাঠামো নির্মাণ, ইকুইপমেন্টস স্থাপন ও পরিচালনায় যুক্ত হবে। এতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে বলে মন্তব্য করে বন্দরের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, প্রকল্পটি নিয়ে সরকারকে কোন ধরনের আর্থিক চাপে পড়তে হবে না–এটা অনেক স্বস্তির।
বে টার্মিনাল বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতার ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন টার্মিনাল বাংলাদেশের মোট কন্টেনার পরিবহনের প্রায় ৩৬ শতাংশ হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে। বড় জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জোয়ার–ভাটা, নাব্যতা ও চ্যানেলের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। ফলে বড় কন্টেনার জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে না। খোলা পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে। বে টার্মিনাল চালু হলে এসব সংকট বহুলাংশে কেটে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সূত্র বলেছে, বে টার্মিনালের উন্নত অবকাঠামোর ফলে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম কমবে এবং বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি ব্যয়ও কমতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশেরও বেশি এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ পরিচালনা করে।
বে টার্মিনাল প্রকল্পে দুটি কন্টেনার টার্মিনাল এবং একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এতে করে শুধু কন্টেনার হ্যান্ডলিংই নয়, খোলা পণ্যবাহী জাহাজের পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও এই বন্দর ভরসার জায়গা হয়ে উঠবে বলে সূত্র জানিয়েছে।












