বস্তায় আদা চাষ, পাল্টে যাচ্ছে কৃষির চিত্র

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া | রবিবার , ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

মসলা জাতীয় ফসল আদার আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং পতিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার নীরব বিপ্লব চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায়। গতানুগতিক কৃষিকাজের প্রথা ভেঙে এখন পেশাদার কৃষকদের পাশাপাশি এলাকার উদ্যমী ও শিক্ষিত তরুণেরাও ঝুঁকছেন আধুনিক ও লাভজনক ‘বস্তায় আদা চাষ’ পদ্ধতিতে। বাড়ির ছাদ, আঙিনা কিংবা যেকোনো অলস ও ফাঁকা জায়গায় স্বল্প খরচ, কম পরিশ্রম আর পরিমিত পুঁজিতে দারুণ আয়ের পথ দেখাচ্ছে এই পদ্ধতি।

রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা বনগ্রামের উদ্যমী তরুণ মোহাম্মদ কলিম উল্লাহ। শিক্ষিত এই তরুণ সীমিত মূলধন নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল থেকে নিজের খামারে বস্তায় আদা চাষের এই প্রকল্প শুরু করেন। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে এলাকার অন্য তরুণ ও স্থানীয় কৃষকদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।

শুধু কলিম উল্লাহই নন, এর আগে বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে আদা চাষ করেছিলেন আরেক তরুণ উদ্যোক্তা সরফভাটার মো. হেলাল উদ্দীন। অনলাইন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি যখন প্রথম ১ হাজারের বেশি বস্তায় পাহাড়ি জাতের আদা চাষ করে সফলতা পান, তখন পুরো রাঙ্গুনিয়ায় এটি নিয়ে বেশ কৌতূহল ও উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

এই পদ্ধতিতে আদা চাষাবাদ বিষয়ে কৃষিবিদ সঞ্জীব সুশীল জানান, ঐতিহ্যগতভাবে মাটিতে আদা চাষ করলে কন্দ পচা রোগসহ নানা জটিলতায় অনেক সময় পুরো খেতের ফসল নষ্ট হওয়ার শঙ্কা থাকে। কিন্তু বস্তায় আদা চাষে সেই ঝুঁকি নেই বললেই চলে। মাটি, বালু ও খামারের গোবরের জৈব সার সুষমভাবে মিশিয়ে খুব সহজেই এই চাষ করা যায়। বিশেষ সুবিধা হলো, কোনো একটি বস্তায় রোগ বা আক্রমণ দেখা দিলে তা সহজেই সরিয়ে ফেলা যায়, ফলে সুরক্ষিত থাকে বাকি গাছগুলো।

সরেজমিনে তরুণ খামারি কলিম উল্লাহর খামারে গেলে তিনি জানান, বর্তমানে তার রয়েছে মোট ২০০টি বস্তা, যেখানে চাষ হচ্ছে উন্নত ফলনশীল ‘বারি২’ জাতের আদা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং সঠিক পরিচর্যা অব্যাহত থাকলে খামারটি থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি আদা উৎপাদনের আশা করছেন তিনি।

জানা যায়, শুধু সরফভাটা কিংবা চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নেই নয়, রাঙ্গুনিয়ার পোমরা, পদুয়াসহ অন্যান্য ইউনিয়নেও ব্যক্তি উদ্যোগে অনেকেই নিজ আঙিনায় এই পদ্ধতিতে আদা চাষাবাদ করেছেন। কৃষকদের উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। রাঙ্গুনিয়ায় বস্তায় আদা চাষ জনপ্রিয় করে তুলতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গেল বছরে মোট ২২৫ জন কৃষককে বিশেষ প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। ‘অনাবাদি ও পতিত জমি এবং বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান’ প্রকল্পের সাহায্যে ২৫ জন কৃষকের প্রত্যেককে ৩০টি করে বস্তা, বীজ আদা ও সার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প (ডিএই অংশ)’-এর সাহায্যে ২০০ জন কৃষককে ১০টি করে বস্তা, বীজ আদা ও সার দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে সরকারি এই উদ্যোগের আওতায় এখন পর্যন্ত ২৭৫০টি বস্তা আদা চাষের জন্য বীজ ও সারসহ বিতরণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কৃষি বিভাগের সার্বিক উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে কৃষকরা নিজ উদ্যোগে আরও প্রায় ৪৫০০টি বস্তায় আদা চাষ করেছেন।

এই ব্যাপারে উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা প্রণব চন্দ্র মজুমদার বলেন, বাড়ির পাশের ছায়াযুক্ত ফাঁকা জায়গা বা অলস ভিটাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলার এই মডেলটি এখন রাঙ্গুনিয়ার সীমানা পেরিয়ে অন্য এলাকার কৃষকদেরও অনুপ্রাণিত করছে। এভাবে কৃষি কাজে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার হলে, একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বাড়বে উৎপাদন, কমবে আমদানি নির্ভরতা। উদ্যোক্তাদের পাশে কৃষি অফিস সর্বদা সহায়তা দিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধডাক বিভাগের রেকর্ড : ২ মাসে পণ্য পরিবহন ৪০০ টন
পরবর্তী নিবন্ধমধ্যরাতে থানার সামনে এএসআইয়ের নাচ-গানের ভিডিও ভাইরাল