আজ ৫ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ আজাদী পদার্পণ করেছে তার প্রতিষ্ঠার ৬৭ বছরে। এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সবদিক দিয়ে অনিশ্চয়তার এ যুগে একটি পত্রিকার ৬৭ বছরে পদার্পণ রীতিমত ঈর্ষণীয় ব্যাপার। আমরা মনে করি, এ সাফল্য শুধুমাত্র আজাদীর নয়, যাঁরা মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত আছেন, পেশাজীবী সাংবাদিক এবং যাঁরা পত্রিকার পাঠক, এ সাফল্য তাঁদের সবার। এতো বছর ধরে টিকে থাকার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, এ পত্রিকার সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে, দেশের স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা আছে।
আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আবদুল খালেক হলেন বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার, যিনি নিজের উজ্জ্বল পেশা ছেড়ে লাইব্রেরি, প্রেস ও পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন এই জনপদের পশ্চাদপদ মুসলিম সমাজকে শিক্ষার মাধ্যমে এগিয়ে নিতে।
‘গণমাধ্যম’ সামপ্রতিক বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। ইংরেজি ‘মিডিয়া’ কথাটি আমাদের পূর্ব পরিচিত। এক সময় ‘সংবাদপত্র’ই ছিল গণযোগাযোগের মাধ্যম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন আর কেবল ‘প্রিন্ট মিডিয়া’ বা কাগজে ছাপা সংবাদপত্রই গণযোগাযোগের মাধ্যম নয়। সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট এমনকি কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহৃত হাতের সেলফোনটিও এখন গণযোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য তথ্যপ্রযুক্তি আবিষ্কারের আগে সিনেমা এবং তথ্যচিত্রও অংশত গণমাধ্যম হয়ে উঠেছিল। তবে সিনেমা ছিল মূলত বিনোদনের মাধ্যম। এ জন্য পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও সাংবাদিকতা শিক্ষার প্রচলিত ধারার পরিবর্তন হয়।
গণমাধ্যমের এই সমপ্রসারিত ব্যবস্থা একদিকে যেমন সবার জন্য তথ্যভাণ্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছে, অন্যদিকে সেই সুবাদে তথ্য জানাকে একটি মৌলিক অধিকারে পরিণত করেছে। উন্নত অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রণীত হয়েছে ‘তথ্য অধিকার আইন’। তথ্য অধিকার এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অপরিহার্য অনুষঙ্গ। আরো একটি মৌলিক পরিবর্তনও কারো দৃষ্টি এড়ায় না। অতীতে প্রিন্ট মিডিয়া বা সংবাদপত্রের আদিযুগে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম শিল্প ছিল না। বর্তমানে তা শিল্প হয়ে উঠেছে। সেই শিল্প–ভুবনে অনন্য নাম ‘দৈনিক আজাদী’। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষণ, স্বৈরাচারী নিপীড়ন, আক্রমণ এবং এই শোষণ–শাসন, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধের সংঘাতময় বাস্তবতার মধ্যে আজাদীর জন্ম।
দৈনিক আজাদী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র । কিন্তু তার জন্ম বাংলাদেশের জন্মের ১১ বছর ৩ মাস ১১ দিন আগে, অর্থাৎ ১৯৬০ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় লাভের পর ১৭ ডিসেম্বর প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক আজাদী। বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘নিরীক্ষা’ সেপ্টেম্বর–ডিসেম্বর ১৯৯৯ সংখ্যায় ‘স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদী’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রেস ইনস্টিটিউটকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়, কেননা তাঁরা আজাদীকে এই স্বীকৃতিটা দিতে কার্পণ্য করেননি।
দৈনিক আজাদী জন্মলগ্ন থেকেই সৎ সাংবাদিকতাই করে আসছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই আজাদী দৃঢ়ভাবে পালন করে এসেছে কল্যাণমুখী, মানবব্রতী ও দেশব্রতী ভূমিকা। সেই ধারাবহিকতায় আজাদী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করেছে বৃত্তি। প্রতি বছর বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী সেই বৃত্তি গ্রহণ করে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা নেয়।
আজাদী চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সংবাদপত্র। সুদীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত চট্টগ্রামের দুঃখ–হাহাকার–সংকট আর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরতে ধরতে এটি পরিণত হয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসার মুখপত্রে। চট্টগ্রামের জনমানুষের কথা বলার জন্য– সর্বোপরি বঞ্চিত ও অবহেলিত জনপদের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার লক্ষ্য নিয়ে ৬৭ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল দৈনিক আজাদী। আজাদী আজ শুধু একটি সংবাদপত্রই নয়, এটি এখন চট্টগ্রামের আয়না হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
দলমতের ক্ষেত্রে আজাদী অনুসরণ করেছে নিরপেক্ষ ইতিবাচক ভূমিকা। আর এ জন্য দলমত নির্বিশেষে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে আজাদী। এই পাঠক সমাজই আজাদীকে বাঁচিয়ে রাখবে। সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে আজাদী লাভ করে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল পদক। দৈনিক আজাদী আজ শুধু একটি সংবাদপত্রই নয়, এটি এখন চট্টগ্রামের আয়না হিসেবেও স্বীকৃত। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজাদীর লেখক–পাঠক–বিজ্ঞাপনদাতা, হকার ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।








