১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে জীবিকার তাগিদে পাকিস্তান পাড়ি দিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। কিন্তু ভাগ্যে ছিল বড় নিষ্ঠুরতা। পাকিস্তানে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হন তিনি। এরপর পাকিস্তানে থাকা বাবা ও দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। এদিকে পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু স্রষ্টার মহিমায় সেই ফরিদ দীর্ঘ ২৫ বছর পর কক্সবাজারের উখিয়ার নিজ বাড়িতে ফিরেছেন।
গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে টিকে–৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। এর মধ্যে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দুই পা।
ব্র্যাকের অভিবাসন শাখা থেকে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি ফরিদকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে। ফরিদকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে শুরু হয় অনুসন্ধান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তার পরিবারের সন্ধান পান।
গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তার ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ফরিদের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কথোপকথনের একপর্যায়ে ফরিদের হাতে একটি আঙুল বেশি অর্থাৎ ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সৈয়দ আলম। ছোটবেলার এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই দুই ভাইয়ের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে। ফরিদ ও তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে তারা পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। তার দুই পা কেটে ফেলতে হয়।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হওয়ার পর এক মানবপাচারকারী তাকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান তিনি। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান ফরিদ। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। পরে তুরস্কের পুলিশ তাকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরিদকে তার ছোট ভাই ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নাড়িছেঁড়া ধনকে কাছে পেয়ে মা নূরজাহান আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ও বাপ, তুই হডে আছিলি! ও বাপ বাপ, তোরে এনডিল্লা হনে গইজ্জে! ১০ বছর গুরা হালে তোরে দেইক্কি, আর ন দেহি। ২৫ বছর পর তোরে পাইয়্যি। ভাইকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত সৈয়দ আলম বলেন, আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমাদের আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্র্যাকের সহায়তায় বড় ভাই ফরিদকে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ার উদ্দেশে রওনা হন সৈয়দ আলম। শুক্রবার সকালে তারা বাড়িতে পৌঁছান।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে আমরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছি। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
তিনি বলেন, তবে শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, আমরা ফরিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আরও কিছু করতে চাই, যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।











