সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে পুরনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে বিশেষজ্ঞ দল। প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড (এইচটুএস) গ্যাসকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্যাংকের পানি বের করার সময় পানিতে দ্রবীভূত গ্যাস মুক্ত হয়ে শ্রমিকদের সংস্পর্শে আসে। এতে একের পর এক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে পানিতে গ্যাসটির প্রকৃত ঘনত্ব, কীভাবে সেখানে গ্যাস তৈরি বা জমা হয়েছিল এবং দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকেরা কী মাত্রায় এর সংস্পর্শে এসেছিলেন, এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর শিল্প মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেন বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা। দলটির প্রধান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ট্যাংকের পানি ও অন্যান্য নমুনা বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে জাহাজের বাতাসে গ্যাসটির উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ট্যাংকের পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় হাইড্রোজেন সালফাইড থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। ট্যাংকের পানি বের করার সময় গ্যাসটি মুক্ত হয়ে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞদলের ধারণা।
তিনি বলেন, বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য আমরা নমুনা দিয়েছি। পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড কী অবস্থায় ছিল, কীভাবে তৈরি বা জমা হয়েছিল, এসব বিষয়ে আরো নিশ্চিত হওয়া যাবে।
১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুরনো এলএনজিবাহী জাহাজ ‘এমটি রাসি’ কাটার সময় একটি ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন শ্রমিকেরা। ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মিলিয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো একজনের মৃত্যু হলে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১০–এ দাঁড়ায়। সর্বশেষ নিহত শ্রমিক ইদ্রিস আলী গত বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
‘এমটি রাসি’ ছিল ২৮০ মিটার দীর্ঘ ও ৪৩ মিটার প্রশস্ত একটি এলএনজি ক্যারিয়ার। জাহাজটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে আসে। ওই বছরের ১৩ জুলাই ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে কাটার জন্য সৈকতে তোলা হয়। এক বছরের বেশি সময়ে জাহাজটির ৭০ শতাংশ কাটার কাজ সম্পন্ন হয়।
জাহাজটিতে চারটি ট্যাংক ছিল। এর মধ্যে একটি ট্যাংকের কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। দুর্ঘটনার সময় তিন নম্বর ট্যাংকে কাজ চলছিল। সেখানে মূলত ডি–ব্যালাস্টিং অর্থাৎ জাহাজের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহৃত পানি বের করার কাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ট্যাংকের ভেতরে থাকা পানিতে জৈব পদার্থের পচন বা অন্য কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরি কিংবা জমা হয়ে থাকতে পারে। পানি বের করার সময় চাপ ও পরিবেশের পরিবর্তনে দ্রবীভূত গ্যাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আবদ্ধ ট্যাংকের ভেতরে থাকা শ্রমিকেরা তা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন।
ঘটনার চার দিন পর বিশেষজ্ঞ দল, শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে ওই ব্যালাস্ট ট্যাংকে প্রবেশ করে নমুনা সংগ্রহ করেন। ওই নমুনা পরীক্ষার পরই পানিতে দ্রবীভূত হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট তদন্তে জৈব পচনশীল কোনো পদার্থ থেকে গ্যাসটি তৈরি হয়ে থাকতে পারে–এমন প্রাথমিক ধারণার কথাও উঠে এসেছে।
তবে দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরীক্ষায় জাহাজের আক্রান্ত অংশে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল। ওই সময় গ্যাসটির মাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৮ পিপিএম। অর্থাৎ বাতাসের প্রতি ১০ লাখ অংশে হাইড্রোজেন সালফাইডের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৮ অংশ। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর এই পরিমাপ নেওয়া হয়েছিল। ফলে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে গ্যাসের প্রকৃত ঘনত্ব কত ছিল, তা ওই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়নি। দুর্ঘটনার এক দিন পরও জাহাজের আক্রান্ত অংশে বিপজ্জনক মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড থেকে গিয়েছিল এবং গ্যাসমুক্ত করার কাজ চালাতে হয়েছিল।
হাইড্রোজেন সালফাইড বর্ণহীন ও অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। পচনশীল জৈব পদার্থের উপস্থিতি, বর্জ্য, নর্দমা, কিছু ধরনের জ্বালানি বা কার্গোর অবশিষ্টাংশ এবং আবদ্ধ ট্যাংকে বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এ গ্যাস তৈরি হতে পারে। জাহাজের আবদ্ধ স্থানগুলোতে এ ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ওএসএইচএ) জাহাজশিল্পে হাইড্রোজেন সালফাইডকে গুরুতর বিষাক্ত গ্যাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ১০ পিপিএমকে জাহাজশিল্পের জন্য অনুমোদিত আট ঘণ্টার গড় এঙপোজার সীমা হিসেবে উল্লেখ করেছে। ১০০ পিপিএমকে ‘ইমিডিয়েটলি ডেঞ্জারাস টু লাইফ অর হেলথ’ বা জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য তাৎক্ষণিক বিপজ্জনক মাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে দুর্ঘটনার চার ঘণ্টা পর ১০ দশমিক ৮ পিপিএম পাওয়া গেলেও সেটিকে দুর্ঘটনার সময়কার প্রকৃত মাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। বরং তদন্তকারীদের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিকেরা আক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তে ট্যাংকের ভেতরে গ্যাসের ঘনত্ব কত ছিল এবং কত দ্রুত সেই ঘনত্ব বেড়েছিল। কারণ আবদ্ধ স্থানে গ্যাসের ঘনত্ব খুব দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞ দল একই সঙ্গে কার্বন মনোঙাইডসহ অন্য কোনো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতিও পরীক্ষা করেছে।
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান জানিয়েছেন, তাদের পরীক্ষায় কার্বন মনোঙাইড পাওয়া যায়নি। হাইড্রোজেন সালফাইডই প্রধান বিষাক্ত গ্যাস হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ট্যাংকের পানির সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থায়।
দুর্ঘটনার পরপর জাহাজটি থেকে বিষাক্ত গ্যাস অপসারণে অভিযান চালানো হয়। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে জাহাজটি পরীক্ষা করেন। এক পর্যায়ে জাহাজের ভেতরে গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় উদ্ধার ও তদন্ত কাজেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসনসহ একাধিক তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে।












