চট্টগ্রাম–কঙবাজার রেললাইনের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে বন্যহাতির চলাচলের নির্মিত আন্ডারপাসের রেলিংয়ের ভাঙা অংশ দীর্ঘ এক বছর পার হলেও সংস্কার করা হয়নি। ফলে র্যালিংবিহীন ওই খোলা অংশ দিয়ে যেকেনো সময় বন্যহাতি রেললাইনে উঠে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে হাতি ও ট্রেনের সংঘর্ষের পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ২২ জুলাই রাতে পশ্চিম পাশে ব্যারিয়ার না থাকা অংশ দিয়ে রেললাইনের উপর চলে আসে একটি বন্যহাতি। ওই সময় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী সৈকত এক্সপ্রেস ঘটনাস্থলে পৌঁছলে রেললাইনের উপর বন্যহাতি দেখতে পান ট্রেনচালক। তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি ব্রেক চেপে ট্রেনটি থামানো হয়েছিল। পরে ঘন ঘন হুইসেল দেয়ার পর বন্যহাতিটি রেললাইন থেকে নেমে যায়। এর কিছুক্ষণ পর বন্যহাতিটি ট্রেনের মাঝখানে একটি বগিতে গিয়ে একাধিকবার ধাক্কা দেয়। পরে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয়ের পাশে নির্মিত আন্ডারপাসের র্যালিং ভেঙে পূর্বপাশে সংরক্ষিত বনের দিকে চলে যায়। তবে এতে কেউ হতাহত না হলেও ট্রেনের বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঘটনার পর রেললাইন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্ডারপাসের র্যালিংয়ের ভাঙা অংশ অপসারণ করে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও সেখানে নতুন করে র্যালিং স্থাপন করা হয়নি। বর্তমানে ওই অংশ খোলা অবস্থায় রয়েছে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সূত্রে জানা যায়, অভয়ারণ্যের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশজুড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইন। যারমধ্যে মাত্র ৪ কিলোমিটার অংশে রেললাইনের উভয় পাশে ব্যারিয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এখনো প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশ অরক্ষিত রয়ে গেছে। ব্যারিয়ার নির্মাণ কাজ চলাকালীন ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয় এলাকায় র্যারিয়ারের অরক্ষিত পকেট গেট দিয়ে রেললাইনে ডুকে পড়েছিল ১০ বছর বয়সী একটি হাতি শাক। ওই সময় ঢাকাগামী কক্সবাজার স্পেশাল ট্রেনের ধাক্কায় হাতিটি গুরতর আহত ও পা ভেঙে গিয়েছিল। ঘটনার একদিন পর রেলওয়ের একটি রিলিফ ট্রেন আহত হাতিটিকে উদ্ধার করে চকরিয়া স্টেশনে নিয়ে যায়। পরে ট্রাকে করে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেদিনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতিটির মৃত্যু হয়। ঘটনার পর রেলওয়ের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ওই সময় বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো অভয়ারণ্য এলাকায় রেললাইনের উভয় পাশে ব্যারিয়ার নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ২০২৫ সালের ২২ জুলাই রাতে ব্যারিয়ার না থাকা অংশ দিয়ে রেললাইনের উপর চলে আসা বন্যহাতি ট্রেনের বগিতে আক্রমণের পর আন্ডারপাসের র্যালিং ভেঙে চলে যায়। ঘটনার পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে দ্রুত র্যালিংয়ের ভাঙা অংশ সংস্কারের জন্য মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু এক বছর অতিবাহিত হলেও ওই অংশ এখনো খোলা অবস্থায় রয়েছে। অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, রেললাইনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
গত ২০ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কার্যালয় সংলগ্ন আন্ডারপাসের র্যালিংয়ের ভাঙা অংশটি এখনো খোলা রয়েছে। ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপসারণ করা হলেও সেখানে নতুন কোনো র্যালিং বা শক্ত বেষ্টনি নির্মাণ করা হয়নি। ফলে আন্ডারপাসের সুরক্ষা কাঠামোর ওই অংশে তৈরি হয়েছে একটি খোলা পথ। এছাড়া ওই সময় যাচ্ছিল কঙবাজারগামী একটি ট্রেন। অভয়ারণ্য এলাকায় ট্রেনের নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলাচল করতে দেখা গেছে। তাই বন্যহাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর চলাচল এলাকায় ট্রেনের গতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক আতাউল হক ভূঁঞা জানান, দোহাজারী–কঙবাজার রেললাইন এখনো ঠিকাদারের কাছ থেকে পুরোপুরিভাবে বুঝে নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বা রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলীর (পূর্ব) সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। তবে, দোহাজারী–কঙবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও প্রধান প্রকৌশলীর মোবাইল ফোনে কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা নুর জাহান জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১০ কিলোমিটার অংশজুড়ে রয়েছে রেললাইন। যারমধ্যে মাত্র ৪ কিলোমিটার অংশে রেললাইনের উভয় পাশে ব্যারিয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যারিয়ারের এই অংশটুকু নির্মাণ কাজ চলাকালীন হাতির সাথে ট্রেনের দুটি ঘটনা ঘটেছে। এখনো অভয়ারণ্যের আরো ৬ কিলোমিটার অংশ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। ওই অংশ দিয়েও যেকোনো সময় বন্যপ্রাণী রেললাইনে চলে আসতে পারে। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কা রয়েই গেছে। এছাড়া আন্ডারপাসের র্যালিংয়ে লোহার এঙ্গেল ভেঙে বন্যহাতি পার হয়ে চলে যাওয়া অংশে শক্ত বেষ্টনি নির্মাণ করতে হবে। কারণ বন্যহাতি চিনে যাওয়া পথ দিয়েই বার বার চলাচলের চেষ্টা করে।
জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, চুনতি অভয়ারণ্যে আন্ডারপাসের র্যালিং ভেঙে যে অংশ দিয়ে হাতিটি চলে গিয়েছিল, সেটি দীর্ঘদিন খোলা রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ওই অংশ দিয়ে আবারও বন্যহাতি রেললাইনে উঠে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যহাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে রেললাইনের অরক্ষিত অংশগুলোতে দ্রুত কার্যকর ব্যারিয়ার নির্মাণের পাশাপাশি ভাঙা র্যালিংয়ের স্থানে শক্ত ও টেকসই বেষ্টনি দিতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।












