কোনো এক নিস্তব্ধ ধূসর ভোরে গ্রিস ও আলবেনিয়ার সীমান্ত ঘেঁষে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ ট্রেন কিংবা বরফাবৃত জনপদে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষ–গ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাতা থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোসের চলচ্চিত্র মূলত এই বিষাদময় ও রূপকধর্মী চিত্রকল্প দিয়েই দর্শককে স্বাগত জানায়। অ্যাঞ্জেলোপুলোসের রূপালী পর্দা কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা সময়, ইতিহাস এবং মানবীয় অস্তিত্বের এক গতিশীল মহাকাব্যিক ভ্রমণ। আধুনিক গ্রিক ইতিহাস, রাজনীতি, নির্বাসন এবং মানচিত্রে আঁকা কৃত্রিম সীমান্তের ক্ষতকে তিনি যেভাবে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। প্রখ্যাত মার্কিন পরিচালক মার্টিন স্করসেসির ভাষায়, অ্যাঞ্জেলোপুলোস ফ্রেমের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ রাখতেন, যেখানে ফ্রেমের সামান্যতম পরিবর্তনও দর্শকের গভীরে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করত।
এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পর্ব শেষ করে তিনি প্যারিসের বিখ্যাত ফিল্ম স্কুলে (IDHEC) চলচ্চিত্র বিদ্যার পাঠ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৭ সালের গ্রিক সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি যখন প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দেন, তখন থেকেই জন্ম নিতে থাকে এমন এক অনন্য দৃশ্যভাষা যেখানে সময় রূপ নেয় স্থানে, আর স্থান রূপান্তরিত হয় সময়ের দীর্ঘ প্রবাহে।
অ্যাঞ্জেলোপুলোসের চলচ্চিত্রকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হলে তাঁর দীর্ঘ টেক বা ‘লং টেক’ এবং ধীরগতির জটিল কোরিওগ্রাফির মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী চিত্রগ্রাহক জিওর্গোস আরভানিতিসের সাথে যৌথ কাজের মাধ্যমে তিনি এক কাব্যিক দৃশ্যভাষার জন্ম দেন। সেখানে ক্যামেরা কোনো তাড়াহুড়ো করে না, বারবার দৃশ্য পরিবর্তন করে দর্শকের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে না; বরং ধীর গতিতে ঘুরে ঘুরে ঐতিহাসিক ঘটনা এবং চরিত্রগুলোর মধ্যবর্তী মানসিক দূরত্বকে উন্মোচিত করে। এই বিশাল দৃশ্যপট জুড়ে শব্দ এবং নীরবতা সমান গুরুত্ব পায়। ধূসর মাটি, বরফ, নদী এবং বৃষ্টিভেজা বিষাদময় রঙের ব্যবহারে যে আবহের সৃষ্টি হয়, তা কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, বরং তা আধুনিক ইউরোপের ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে নির্দেশ করে।
ইতিহাসের ট্রিলজি ও রাজনীতির নাট্যমঞ্চ
অ্যাঞ্জেলোপুলোসের শৈল্পিক যাত্রার প্রথম পর্যায়টি ছিল আধুনিক গ্রিসের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাস পুনর্গঠনের এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম। ১৯৭০–এর দশকে তিনি নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক ট্রিলজি, যা ‘ডেজ অফ থার্টি সিক্স’ (১৯৭২), ‘দ্য ট্র্যাভেলিং প্লেয়ার্স’ (১৯৭৫) এবং ‘দ্য হান্টার্স’ (১৯৭৭) চলচ্চিত্র তিনটি নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ‘দ্য ট্র্যাভেলিং প্লেয়ার্স’ চলচ্চিত্রটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক কালজয়ী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রায় চার ঘণ্টার এই দীর্ঘ চলচ্চিত্রে মাত্র ৮০টি শট ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে ক্যামেরা কোনো দৃশ্যমান কাট ছাড়াই ১৯৩৯ থেকে ১৯৫২ সালের জটিল রাজনৈতিক রূপান্তরগুলোকে এক ফ্রেমে তুলে ধরেছে।
এই চলচ্চিত্রের গল্পটি আবর্তিত হয় একটি ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলকে ঘিরে, যারা গ্রিসের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে ‘গলফো দ্য শেফার্ডেস’ নামক একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রিক নাটক পরিবেশন করে। কিন্তু তাদের মঞ্চায়নে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় নাৎসি দখলদারিত্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রক্তক্ষয়ী গ্রিক গৃহযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ডানপন্থী সামরিক জান্তার শাসনকাল। পরিচালক এখানে ক্লাসিক্যাল গ্রিক নাটক এশাইলাসের ‘ওরেস্টেয়া’ রূপক ব্যবহার করে বাস্তব রাজনৈতিক রক্তাক্ত ইতিহাসকে রূপালী পর্দায় এনে দাঁড় করান। ব্রেখটিয়ান নাট্যরীতি অনুসরণে নির্মিত এই দৃশ্যগুলোতে রাজনীতি কোনো দূরবর্তী বস্তু নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনকে পেষণ করার এক ঐতিহাসিক শক্তি হিসেবে হাজির হয়।
পরবর্তীতে আশির দশকে বার্লিন প্রাচীর পতন ও বামপন্থী আদর্শের বিপর্যয়ের পর অ্যাঞ্জেলোপুলোসের মনোযোগ জাতীয় রাজনীতি থেকে আত্মিক এবং অস্তিত্বসংক্রান্ত অনুসন্ধানের দিকে মোড় নেয়। সৃষ্টি হয় তাঁর ‘নীরবতার ট্রিলজি’, যার মধ্যে রয়েছে ‘ভয়েজ টু সিথেরা’ (১৯৮৪), ‘দ্য বিকিপার’ (১৯৮৬) এবং ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’ (১৯৮৮)। রাজনৈতিক বড় বড় আদর্শ ধসে পড়ার পর মানুষ যে চরম একাকীত্ব ও শূন্যতায় নিমজ্জিত হয়, এই ছবিগুলোতে সেই নিঃসঙ্গতার করুণ সুর ধ্বনিত হয়েছে।
অদৃশ্যের খোঁজে যাত্রা: কুয়াশা ও সীমান্তে জীবন–মৃত্যুর সংযোগ
অ্যাঞ্জেলোপুলোসের আখ্যানগুলোতে ‘সীমান্ত’ একটি বহুমাত্রিক দার্শনিক রূপক। সীমান্ত কেবল দুটি দেশের কাঁটাতার বা পুলিশি চেকপোস্ট নয়, বরং তা জীবন ও মৃত্যু, বর্তমান ও স্মৃতি, কিংবা আত্ম ও অপরের মধ্যবর্তী এক অনিশ্চিত রেখা। ১৯৯০–এর দশকে নির্মিত তাঁর বিখ্যাত ‘সীমান্তের ট্রিলজি’–অর্থাৎ ‘দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অফ দ্য স্টর্ক’ (১৯৯১), ‘ইউলিসিস গেজ’ (১৯৯৫) এবং ‘ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে’ (১৯৯৮)-এই সীমান্ত চেতনারই এক মহাকাব্যিক রূপায়ণ।
১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’ চলচ্চিত্রে এই বিষাদময় যাত্রার সবচেয়ে আবেগঘন প্রকাশ ঘটে। গল্পের মূল চরিত্র দুটি শিশু–ভুলা এবং তার ছোট ভাই আলেকজান্ডার। তারা এক অজানা ও কাল্পনিক পিতার খোঁজে ট্রেনে চেপে যাত্রা শুরু করে, যার ঠিকানা নাকি অনেক দূরে, জার্মানিতে। বাস্তবে গ্রিসের সাথে জার্মানির কোনো স্থল সীমান্ত নেই, কিন্তু শিশুদের নিষ্পাপ মনে গভীর বিশ্বাস থাকে যে সীমান্ত পার হলেই তারা পিতার দেখা পাবে। যাত্রাপথে তারা শিল্পায়নের ধূসর ল্যান্ডস্কেপ, নিষ্ঠুর প্রাপ্তবয়স্কদের জগত এবং অবর্ণনীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হয়। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে যখন তারা কুয়াশাবৃত এক নদী পার হয়ে অজানা নদীর তীরে পৌঁছায়, তখন অন্ধকারের ভেতর থেকে জেগে ওঠে একটি একাকী গাছ। শিশুরা দৌড়ে গিয়ে সেই গাছটিকে জড়িয়ে ধরে। রূপক বিচারে এই যাত্রা কেবল পিতা খোঁজার গল্প নয়, এটি যেন ঈশ্বর ও জীবনের আদি সত্যকে খুঁজে পাওয়ার এক আধ্যাত্মিক অডিসি।
সীমান্তের এই স্থগিত অস্তিত্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে ১৯৯১ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য সাসপেন্ডেড স্টেপ অফ দ্য স্টর্ক’এ। গ্রিস ও তুরস্কের সীমান্তে এক সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এক সেনা কর্মকর্তা যখন সীমান্ত রেখার ওপর তাঁর একটি পা বাতাসে তুলে ধরেন, তখন দৃশ্যপটে নেমে আসে এক থমথমে নীরবতা। কর্মকর্তাটি স্বগতস্বভাবসিদ্ধভাবে বলেন, যদি তিনি এই একটি পা বাড়ান, তবে তিনি অন্য কোথাও চলে যাবেন, অথবা মারা যাবেন। অ্যাঞ্জেলোপুলোসের এই একটি দৃশ্য আধুনিক বিশ্বের শরণার্থী সংকট, ভৌগোলিক বিভাজন এবং জাতীয়তাবাদের অসারতাকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করে দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম বিজয়ী ‘ইটারনিটি অ্যান্ড আ ডে’ চলচ্চিত্রে পরিচালক সময়ের আপেক্ষিকতাকে এক বিদগ্ধ রূপ দান করেন। জীবনের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ কবি আলেকজান্ডার এক আলবেনীয় এতিম বালককে সীমান্ত পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করে এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ায়। চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে আসে গ্রিক শব্দ ‘আগাদিনি’, যার অর্থ ‘বড্ড দেরি হয়ে যাওয়া’। যখন জীবনের সব বসন্ত পার হয়ে গেছে, তখন কবি উপলব্ধি করেন যে জীবনের প্রকৃত অর্থ লুকিয়ে ছিল ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর ভালোবাসায়। বালকটি যখন কবিকে প্রশ্ন করে, “আগামীকাল কত দীর্ঘ?”, কবি বিষণ্ন হেসে উত্তর দেন: “অনন্তকাল এবং একটি দিন”।
বিষাদের সুরশাস্ত্র ও চিরন্তন হোমরিক সফর
অ্যাঞ্জেলোপুলোসের চলচ্চিত্রের চিত্রকল্পকে যদি কোনো শরীর বলা হয়, তবে তার আত্মা হলো সুরকার এলেনি কারাইন্দ্রুর সঙ্গীত। ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁদের দীর্ঘ যৌথ কাজ সিনেমা ও সঙ্গীতের এক অভূতপূর্ব কাব্যিক মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। কারাইন্দ্রুর সৃষ্টিতে বাজানো পাহাড়ি ক্লাইনেটের বিষাদময় সুর, ব্যাঙ্গেলিস ক্রিস্টোপুলোসের ওবো এবং ফ্রেঞ্চ হর্নের ধ্বনি ফ্রেমে দৃশ্যমান কুয়াশাকে যেন আরও বেশি ঘনীভূত ও অর্থবহ করে তোলে।
১৯৯৫ সালের ‘ইউলিসিস গেজ’ চলচ্চিত্রে বলকান যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ভেতর হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রের প্রথম তিনটি রিল খোঁজার জন্য অভিনেতা হার্ভি কাইটেল যে যন্ত্রণাদগ্ধ যাত্রা করেন, কারাইন্দ্রুর সুরের মূর্ছনা সেই দৃশ্যের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিকে এক অন্য মাত্রা দেয়। অ্যাঞ্জেলোপুলোসের ফ্রেমের দীর্ঘ নীরবতাগুলো কখনো শূন্য থাকে না; সেগুলো ভরিয়ে তোলে বাতাস, বৃষ্টি ও নদীর শব্দ এবং কারাইন্দ্রুর আবহামূলীয় সঙ্গীত।
অ্যাঞ্জেলোপুলোসের সিনেমা কোনো সহজ রৈখিক গল্প বলে না; এটি একটি চিরন্তন হোমরিক সফর বা গৃহমুখী যাত্রা। তাঁর চরিত্রগুলো যেন আধুনিককালের ইউলিসিস, যারা ক্রমাগত গৃহের খোঁজে, হারানো ইতিহাসের খোঁজে এবং মানুষের সাথে মানুষের হারিয়ে যাওয়া আত্মিক সংযোগের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। ২০১২ সালে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ‘দ্য আদার সি’ নির্মাণের সময় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এই কালজয়ী পরিচালকের প্রয়াণ ঘটে। কিন্তু তাঁর সেলুলয়েডে আঁকা সেই ধূসর ল্যান্ডস্কেপ, কুয়াশাবৃত নদী আর একাকী গাছগুলো আজও বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে–ঝড়ঝাপটা ও রাজনৈতিক ক্ষয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয়, বরং তা মানবীয় মর্যাদা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে কাব্যিক ও শক্তিশালী মাধ্যম ।










