এক–দুই দিন নয়, টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নগরীর কোর্টহিলের একটি সংযোগ ব্রিজের ওপর আটকা পড়েছিল দুটি অসহায় কুকুর। কারো যেন দৃষ্টিতেই পড়ছিল না তাদের বুকফাটা আর্তনাদ। কেউ দেখলেও এড়িয়ে গেছেন, কেউবা নির্বিকার থেকেছেন। কিন্তু পশুপাখির প্রতি ভালোবাসার অনন্য নজির গড়ে মানবিকতার পরিচয় দিলেন বিচার বিভাগের এক কর্মচারী। তারই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ টিম এসে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করল কুকুর দুটিকে।
ঘটনাটি গতকাল সন্ধ্যার কিছু সময় আগের। চট্টগ্রামের সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী বরাত চৌধুরী সংযোগ ব্রিজ ব্যবহার করে পুরাতন এনেক্স ভবন (বর্তমানে নারী–শিশু বিল্ডিং) থেকে নতুন আদালত ভবনে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি দুটি কুকুরকে ব্রিজের ছাদে দেখতে পান এবং বুঝতে পারেন যে, তারা সেখানে আটকা পড়েছেন। একপর্যায়ে তিনি তাদের উদ্ধারে মানবিক তৎপরতা শুরু করেন। খবর দেন ফায়ার সার্ভিসকে। এরই ধারাবাহিকতায় ফায়ার সার্ভিস নন্দনকানন স্টেশনের বিশেষ একটি টিম সন্ধ্যার সময় ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে প্রাণে বেঁচে গেল অসহায় প্রাণী দুটি। কোর্টহিলের মতো জনবহুল এলাকায় কুকুর দুটি কীভাবে ওই উঁচুতে উঠেছিল, তা এখনো রহস্য। ধারণা করা হচ্ছে, খাবার বা অন্য কোনো কৌতূহলবশত তারা সেখানে উঠে আটকা পড়েছিল এবং পরবর্তীতে নামার কোনো পথ খুঁজে পায়নি। টানা প্রায় একসপ্তাহ ধরে মাথার ওপর রোদ–বৃষ্টির তাণ্ডব, পেটে দানা–পানি নেই, আতঙ্কে কুঁকড়ে ব্রিজের ওপর দিন কাটাচ্ছিল তারা।
সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী মো. বরাত চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে তার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, সন্ধ্যার কিছু সময় আগে পুরাতন এনেঙ ভবন থেকে নতুন আদালত ভবনে যাওয়ার সময় সংযোগ ব্রিজের ছাদের ওপর কুকুর দুটিকে দেখতে পাই। বিষয়টি সহকর্মীদের জানালে তারা ছুটে আসেন। আমরা খাবার দিয়েও তাদের নামাতে ব্যর্থ হই। পরে ৯৯৯ ও ফায়ার সার্ভিসে কল করি। তিনি জানান, মহানগর জিআরও শাখার রুম থেকেও বিগত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কুকুরগুলোকে দেখা গেলেও কেউ বিষয়টিকে আমলে নেননি। কিন্তু তার নজরে আসার পরই তিনি এটিকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নেন। বরাত চৌধুরী বলেন, আমি বুঝতে পেরেছিলাম সাধারণ উপায়ে এদের নামানো অসম্ভব। কুকুর দুটি আতঙ্কগ্রস্ত থাকায় ফায়ার সার্ভিসকে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়েছে। কর্মীরা বিশেষ রেসকিউ ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করে সুপরিকল্পিত উপায়ে কোনো আঘাত না দিয়ে ওদের নিচে নামিয়ে আনেন। আজ ওদের নিরাপদে উদ্ধার করতে পেরে ভেতরে অন্যরকম এক শান্তি অনুভব করছি। এই মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন আইনজীবীরাও।
অ্যাডভোকেট টুটুল রায় বলেন, আমি গত ৫–৭ দিন ধরে কুকুর দুটিকে ওই ব্রিজে দেখছিলাম। খাবার দেওয়ারও চেষ্টা করেছি। ভাবছিলাম নিজে ফায়ার সার্ভিস অফিসে যাব, এর আগেই দেখলাম ফায়ার সার্ভিস এসে ওদের উদ্ধার করল। অপারেশন সফল হওয়ার পর উপস্থিত উৎসুক জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সাধুবাদ জানান।
ফায়ার সার্ভিস নন্দনকানন স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মাসুদ রানা দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রাণীদের প্রতি মমতা প্রদর্শন করা আমাদের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। অসহায় প্রাণীগুলোর বিষয়ে খবর পাওয়া মাত্রই আমরা বিন্দুমাত্র বিলম্ব করিনি।
নগর পুলিশের সদস্য রেজাউল করিম সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারীর এই মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এমন ঘটনা পশুপ্রেমীদের মনে নতুন আশার আলো জ্বেলে দেয়। এটি প্রমাণ করে, একটু সচেতনতা আর সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো অসহায় প্রাণকে রক্ষা করা সম্ভব।










