ক্রেনের সমস্যা নয়, বাড়তি ওজন এবং ভারসাম্যহীন ওজনের কারণেই চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কন্টেনার টার্মিনাল (সিসিটি) জেটিতে কী গ্যান্ট্রি ক্রেন থেকে কন্টেনার ছিঁড়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ না করে এবং ঘোষণা না দিয়ে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই ছিল। ঘটনার সময় প্রাইম মুভার চালকসহ ৬ জন শ্রমিক ভাগ্যক্রমে রক্ষা পেয়েছেন।
বন্দরের কী গ্যান্ট্রি ক্রেনের তার ছিঁড়ে কন্টেনার পড়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে বাড়তি ওজনের পণ্য পরিবহনের বিষয়টি ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে সিসিটির ৩ নম্বর জেটিতে নোঙর করা ‘চেং হাই’ জাহাজ থেকে ৪ নম্বর কী গ্যান্ট্রি ক্রেন (কিউজিসি) দিয়ে একটি ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেনার খালাস করা হচ্ছিল। কন্টেনারটি বেসরকারি কন্টেনার ডিপো ইনকনট্রেডে নেওয়ার জন্য প্রাইম মুভারের চেসিসে তোলার প্রস্তুতির সময় বিকট শব্দে সেটির এক পাশ ছিঁড়ে যায় এবং ভেতরে থাকা বিশাল আকৃতির গাছের গুঁড়িগুলো নিচে পড়ে। এতে পুরো অপারেশন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কন্টেনারটি এমনভাবে ছিঁড়ে যায় যেন কাপড় ছিঁড়ে গেছে। কন্টেনার বহনের স্প্রেডারের চারটি হুকের মধ্যে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাকি তিনটি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল। ফলে প্রাথমিকভাবে ক্রেনের যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়। দুর্ঘটনার পর কন্টেনারটি পরীক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, এতে মোট সাতটি বড় গাছের গুঁড়ি ছিল। এর মধ্যে একটি গুঁড়ির ওজন প্রায় ৭ টন। ওজন মেপে দেখা যায়, কন্টেনারে মোট পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৫ টন। অথচ আমদানি ঘোষণাপত্রে পণ্যের ওজন দেখানো হয়েছিল পৌনে ২০ টনের মতো। অর্থাৎ ঘোষিত পরিমাণের বাইরে প্রায় ১৫ টন অতিরিক্ত পণ্য দেশে আনা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন।
ঘোষণার চেয়ে ১৫ টন এবং ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৫ টন বেশি পণ্য বোঝাই করে তা জাহাজিকরণ করা হয়েছে। একইসাথে কন্টেনারের ভেতরে পণ্যের ভারসাম্য রক্ষা না করেই জাহাজে তোলা হয়। এতে শুল্ক ফাঁকির পাশাপাশি ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিপিং এজেন্ট সী কনসোর্টিয়াম এবং মায়েরস্ক লাইনের গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৪০ ফুট কন্টেনারে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ৪৮০ কেজি বা প্রায় ৩০.৪৮ টন পণ্য বহনের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কন্টেনারে সেই সীমা অতিক্রম করে প্রায় ৫ টন বেশি পণ্য বোঝাই করা হয়েছিল। পাশাপাশি গাছের ভারী গুঁড়িগুলো কন্টেনারের ভেতরে সমানভাবে সাজানো হয়নি। ফলে ক্রেন দিয়ে উত্তোলনের সময় অতিরিক্ত চাপ একদিকে কেন্দ্রীভূত হয়ে কন্টেনারের কাঠামো ভেঙে পড়ে।
বন্দরের একজন ক্রেন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্প্রেডারের প্রতিটি হুক প্রায় ১০ টন করে, অর্থাৎ মোট ৪০ টন পর্যন্ত ওজন বহনে সক্ষম। তাই এটি ক্রেনের সক্ষমতার সমস্যা নয়। মূল সমস্যা ছিল কন্টেনারের ভেতরে পণ্য সঠিকভাবে ব্যালেন্স না করা। একদিকে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় উত্তোলনের সময় কন্টেনার কাত হয়ে ছিঁড়ে যায়।
সূত্র বলেছে, কয়েক বছর আগ পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে মুচলেকা দিয়ে অতিরিক্ত ওজনের কন্টেনার আনার সুযোগ থাকলেও সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। এরপর থেকে কন্টেনারের ওজন ও নিরাপদ লোডিং নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত শিপিং লাইন ও পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানের ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। জাহাজ থেকে কন্টেনার খালাসের আগে বন্দরের পক্ষ থেকে নিয়মিত ওজন যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী অন্তত ৫ জন শ্রমিক গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে ক্রেনের নিচ থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যথায় ধসে পড়া গাছের গুঁড়ির নিচে চাপা পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারত। একইভাবে প্রাইম মুভারের চালকও তখন গাড়ির কেবিনে অবস্থান করছিলেন। কন্টেনারটি চেসিসের ওপর ভেঙে পড়লেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনার তদন্তে টার্মিনাল ম্যানেজার মুহাম্মদ আনিস উদ্দিন আহমদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘোষণাবহির্ভূত অতিরিক্ত পণ্য আমদানি, ধারণক্ষমতার বেশি ওজন বহন এবং নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরো বড় সংকট তৈরি হতে পারে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ বিশ্বব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং আইএসপিএস কোড নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেবে।












