নব্বই দশকের শিশুরা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তাদের নিশ্চয় পারুলের কথা মনে আছে। ওই সময় বিটিভিতে তারা মনোযোগ দিয়ে একটি অনুষ্ঠান দেখত, সেটি হলো ‘মনের কথা’। পারুল নামের একটি মেয়ে পুতুল হাত পা নেড়ে গান গাইত, অজানা কথা জানাত। তার সঙ্গী থাকতো একজন শুভ্র হাসির শিল্পী। যিনি ক্যানভাসে আঁচড় দিয়ে শেখাতেন কিভাবে ছবি আঁকতে হয়। যিনি জানাতেন দেশ, শিল্প নিয়ে অনেক অজানা কথা। পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে দেখা যেত একজন বাউল ও একটি গরুকে।
বাংলাদেশের পাপেটম্যান হিসেবে পরিচিত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তফা মনোয়ার। মা জামিলা খাতুনকে হারিয়েছেন খুব ছোট বয়সেই। বাবা গোলাম মোস্তফা ছিলেন কবি, পেশায় ছিলেন শিক্ষক। শিক্ষকতার সূত্রে নানা জায়গায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষাজীবনের শুরু কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। এই স্কুলে পড়ার সময় তিনি বাবা ও বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সংগীতের তালিম নেন। পরবর্তীকালে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নতুন করে আবার সংগীতে মনোযোগী হন। তালিম নেন ওস্তাদ ফাইয়াজ খানের শিষ্য ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে।
মুস্তাফা মনোয়ারের আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুণ একটি গল্প। নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি ভর্তি হন বিজ্ঞানে, কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে। অথচ অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। পাশের ফ্ল্যাটেই থাকতেন কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি প্রায়শই মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করতেন। তিনি কলকাতা আর্ট কলেজে নিয়ে গেলেন। শিল্পচার্য রমেন চক্রবর্তী ছবি দেখে খুশি হয়ে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। এখানে তিনি দারুণ কৃতিত্ব দেখান, ১৯৫৯ সালে চারুকলায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে চারুকলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মুস্তফা মনোয়ার। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সেখানে কর্মরত থাকার পর দেশে নতুন এক গণমাধ্যমের সূচনা হয়। ১৯৬৪ সালে ডিআইটি ভবনে টেলিভিশন যাত্রা করলে, সেখান থেকে অনুরোধ করা হয় তাঁকে যোগদানের। তিনি যোগ দিলেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপ মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।
বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও পাপেট প্রদর্শনের পথপ্রদর্শক মুস্তফা মনোয়ার। কৈশোরে দেখা পুতুল নাচ নতুনরূপে ধরা দেয় তাঁর তৈরি পাপেটে। ছাত্রবস্থায় ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেন। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনে কাজ করার সুবাদে পাপেট প্রদর্শনের বিরাট এক ক্ষেত্র পেয়ে গেলেন তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুই চরিত্রের জন্ম দেন, শুরু করেন পাপেটের প্রদর্শনী। কেবল ‘আজব দেশে’ নয়, ‘মনের কথা’, ‘মীনা কার্টুন’, ‘নতুন কুঁড়ি’সহ আরও অনেক অনুষ্ঠানে পরিকল্পক হিসবে অনন্য অবদান রাখেন তিনি। তাঁর বানানো পাপেটগুলোতে স্থান পায় বাউল, গরু, শামুকভাঙা, চেগাপাখি, পানকৌড়ি, হাঁস, লম্বা গলার বক আরও অনেককিছু।
বিটিভির জন্য তিনি ‘রক্তকরবী’ এবং শেক্সপিয়ারের টেমিং অব দ্য শ্রু অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকটিও বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পরিচালনায়। যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্টি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট মিশুকের নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ারই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল রঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপন করেছিলেন।
১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আঁকা কার্টুনের জের ধরে তাকে সাময়িকভাবে কারারুদ্ধ করা হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাপেটশিল্পী হিসেবে মূল্যবান অবদান রাখেন। শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মনোবল বাড়ানোর জন্য তিনি তার দক্ষতার পূর্ণ ব্যবহার করেন। আয়োজন করেন পাপেট প্রদর্শনীর। ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ ও ‘একজন সাহসী কৃষক’ সহ তার বিখ্যাত পাপেট শোগুলো দর্শকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে একুশে পদক পাওয়া এই শিল্পী বর্ণিল কর্মজীবনে আরও অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়াও টেনাশিনাস পদক, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার, চট্টগ্রামের কিডস সম্মাননা পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। গত ২৯ জুন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান।








