গত তিন দিন ধরে চট্টগ্রামে টানা প্রবল বৃষ্টির কারণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে জনজীবন চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি সব সময়ই অনেকেই একতরফাভাবে মেয়র, মন্ত্রী কিংবা সরকারকে দায়ী করছেন। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত কিছুটা ভিন্ন।
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কোনো একদিনে তৈরি হওয়া সমস্যা নয়; এটি বহু বছরের পরিকল্পনার ঘাটতি, অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ, দখল, অনিয়ম এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত ফল। তাই শুধু একজন মেয়র, একজন মন্ত্রী বা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সর্বোপরি নাগরিকদের সক্রিয় সহযোগিতা।
প্রতিবছর জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে নালা ও খাল খনন, সংস্কার এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব থাকলে সেই প্রকল্পগুলোর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
অন্যদিকে, আমাদের নিজেদেরও দায় কম নয়। বাড়ি নির্মাণের সময় অনেকেই পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রাখি না। কোথাও কোথাও খাল–নালা দখল করা হয়। আবার পলিথিন, প্লাস্টিক, নির্মাণসামগ্রীর বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনা নালা–খালে ফেলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
আমার বিশ্বাস, প্রশাসনের পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা যেমন জরুরি, তেমনি আইনের নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগও অত্যন্ত প্রয়োজন। আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হতে হবে। অপরাধী বা আইন ভঙ্গকারী ব্যক্তি যে–ই হোক তার সামাজিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক অবস্থান যেন আইনের প্রয়োগে কোনো প্রভাব না ফেলে। সুপারিশ, প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে যদি আইনের শাসন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শুধু জলাবদ্ধতা নয়, যানজট, ফুটপাত দখল, অবৈধ স্থাপনা কিংবা অন্যান্য নাগরিক সমস্যাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায় যে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে। এই ধারণা দূর করতে হলে আইনের শাসনের প্রতি সবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। যখন মানুষ দেখবে যে আইন সবার জন্য সমান, তখন নিয়ম ভাঙার প্রবণতাও অনেক কমে যাবে।
তাই শুধু দোষারোপ নয়, প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং সর্বোপরি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে ধীরে ধীরে মুক্ত করা সম্ভব। অন্যথায়, এই ভোগান্তি আমাদের আরও বহু বছর বহন করতে হবে।












