শিপ ব্রেকিং বা জাহাজ্লভাঙা শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। সংকটে এই শিল্পে বিনিয়োগকৃত কোটি কোটি টাকা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে গ্রিন ইয়ার্ড তৈরি করা হলেও একের পর এক শিপইয়ার্ডে হামলা, মালামালবাহী যানবাহনে বাধা, রাস্তা বন্ধ, লুটপাট, কর্মকর্তাদের মারধর এবং চাঁদা দাবির ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নানা অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনায় অনেক ইয়ার্ড ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো নতুন করে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে সংঘবদ্ধ চক্রের অপতৎপরতায় সেগুলো আদৌ চালু রাখা যাবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মালিকেরা থানা পুলিশ থেকে শুরু করে নানা দুয়ারে ধর্ণা দিয়েও রক্ষা পাচ্ছেন না। নানা ঘটনা শিপ ব্রেকিং সেক্টরে উদ্বেগ–উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)।
সূত্রে জানা যায়, ষাটের দশকে আকস্মিক ও অপরিকল্পিতভাবে সীতাকুণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলে শুরু হয়েছিল শিপ ব্রেকিং শিল্প। ১৯৬০ সালের প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ে এমভি সী আল ফাইন নামে বৃহৎ একটি জাহাজ সীতাকুণ্ড উপজেলার ফৌজদারহাট সমুদ্র উপকূলের ডাঙ্গায় উঠে আসে। অনেক চেষ্টা করেও জাহাজটিকে সাগরে ভাসানো সম্ভব হয়নি। পরে মালিকপক্ষ জাহাজটি নিলামে বিক্রি করে দেন। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী জাহাজটি কিনে নিয়ে কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করেন। পরবর্তীতে জাহাজটি ভেঙে বিক্রি করা হয়।
স্বাধীনতার পর কয়েকটি জাহাজ এনে ভেঙে বিক্রি করা হয়। ১৯৭২ সাল থেকে টুকটাক জাহাজ আমদানি শুরু হলেও ১৯৭৯ সালে এসে ব্যবসাটি জমজমাট হয়। আশির দশকে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট উপকূলীয় এলাকায় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড তৈরি হতে থাকে। পরবর্তীতে নানা ধাপে শিপ ব্রেকিং শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে। ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার উপকূল এলাকায় এর বিস্তার ঘটে। দেড়শটির বেশি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পুরনো জাহাজ কিনে এনে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করার মাধ্যমে এই শিল্পের সাথে জড়িত হন হাজার হাজার মানুষ। একসময় প্রায় দুই লাখ শ্রমিক এই শিল্পে কাজ করতে থাকেন। পরোক্ষভাবে যুক্ত হন আরো প্রায় তিন লাখ মানুষ। বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ট্যাঙ প্রদান ছাড়াও দেশের অর্থনীতিতে এই শিল্প বড় ভূমিকা রাখতে থাকে। বিভিন্ন ব্যাংক হাজার হাজার কোটি টাকা এই শিল্পে বিনিয়োগ করে। শুধুমাত্র শিপ ব্রেকিং শিল্পকে টার্গেট করে সীতাকুণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলে দেশের সবগুলো তফশিলী ব্যাংক আলাদা শাখা স্থাপন করে কার্যক্রম চালাতে থাকে। শিপ ব্রেকিং শিল্প খ্যাত হয় ভাসমান লোহার খনি হিসেবে।
জাহাজ কেটে টুকরো করে লৌহা হিসেবে বিক্রি করা মূল ব্যবসা হলেও এর সাথে ফার্নিচার, ক্রোকারিজ, ইলেকট্রিক সামগ্রী, নানা রকমের বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য সামগ্রীর বিশাল বাজার উড়ে ওঠে। বলা হয়, একটি জাহাজ মানে ছোট্ট একটি দেশ। একটি দেশের নাগরিকদের জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই থাকে এসব জাহাজে। লোহা ছাড়াও মূল্যবান তামা, পিতল, স্টেনলেস স্টিল, নানারকম ফার্নিচার, রাডার, টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম, ইলেকট্রনিঙ সামগ্রী, কম্পিউটার, ক্রোকারিজ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, টেলিভিশন, সুই–সুতো মিলে হরেক রকমের পণ্য থাকে একেকটি জাহাজে। এসব জাহাজে যা পাওয়া যায় সবকিছুর চাহিদা রয়েছে দেশে–বিদেশে। শিপ ব্রেকিংয়ের কল্যাণে এমন সব গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য সহজে পাওয়া যায়, যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় উচ্চ মূল্যে। ফৌজদারহাট থেকে কুমিরা পর্যন্ত এলাকা সরগরম থাকত উপরে উল্লেখিত বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায়ীদের পদভারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের ধনাঢ্য অনেক ব্যবসায়ী শিপ ব্রেকিং শিল্পের সাথে জড়িত হন। বিভিন্ন ব্যাংক এগিয়ে এসে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। এই শিল্প থেকে প্রাপ্ত লোহা দিয়ে রি রোলিং মিলগুলোতে রড তৈরি করা হয়। মেল্টিং স্ক্র্যাপ দিয়েও তৈরি হয় রড। দেশের রডের চাহিদার একটি বড় অংশের যোগান শিপ ব্রেকিং সেক্টর থেকে দেওয়া হচ্ছিল।
কিন্তু সময় পাল্টাতে শুরু করেছে। নানা সংকটে পড়ে অনেক শিপ ব্রেকিং ব্যবসায়ী বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন। ঋণখেলাপি হয়ে দেশ ছেড়েছেন কেউ কেউ। ব্যবসা–বাণিজ্যের অবস্থা নাজুক হওয়ায় অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। অন্তত শ’ দুয়েক ইয়ার্ড তৈরি হলেও সাম্প্রতিক হিসেবে চালু শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি। এর মাঝে গ্রিন শিপ ইয়ার্ড গড়ে তোলার বাধ্যবাধকতার কারণে একেকটি ইয়ার্ডকে এক থেকে দুইশ কোটি টাকা বাড়তি বিনিয়োগ করতে হয়। এই বাড়তি বিনিয়োগের ধকল সামলাতে না পেরে অনেক শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গত দুই–তিন বছরে কোনো জাহাজ আনতে পারেনি। একসময় সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে ২৫টি পর্যন্ত জাহাজ আসত। এখন জাহাজের আকাল চলছে।
শিপ ব্রেকিং সেক্টরের বেহাল এই অবস্থার মাঝে নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে চাঁদাবাজি। সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের অন্তত সাতটি শিপইয়ার্ডে চাঁদাবাজ চক্র হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ইয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে বিওবি শিপ রিসাইক্লার্স, বারাকা শিপব্রেকিং, সাগরিকা শিপব্রেকিং, জনতা শিপব্রেকিং, ফোরস্টার, মেহেরুন শিপব্রেকিং এবং টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।
অভিযোগ অনুযায়ী, বারআউলিয়া এলাকায় অবস্থিত বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সে একটি চক্র মালিক ও কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পথ রোধ করে জিম্মি করার চেষ্টা চালায়। এ সময় তাদের বহনকারী গাড়িতে হামলা, কর্মকর্তাদের মারধর এবং চাঁদা দাবি করা হয়। সাগরিকা ও বারাকা শিপ ইয়ার্ডে যাতায়াতের পথে টিনের বেড়া দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে আরেকটি চক্রের বিরুদ্ধে। একইভাবে জনতা, ফোরস্টার ও মেহেরুন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে মালামালবাহী যানবাহন আটকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা। শতাধিক দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র নিয়ে টি আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে প্রবেশ করে মালামাল লুটপাট করে, কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং ইয়ার্ড দখলের চেষ্টা করে।
একজন শিপ ব্রেকিং ব্যবসায়ী বলেছেন, একশ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করে আমাদের ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করেছি। টাকার যোগান কমে যাওয়ায় ছোট একটি জাহাজ এনে কাটার চেষ্টা করছি। কিন্তু দাগী একজন সন্ত্রাসীর কারণে আমাদের ইয়ার্ডে গাড়ি প্রবেশ করতে পারছে না। সে টিন দিয়ে আমাদের ইয়ার্ডের রাস্তা ঘেরাও করে দিয়েছে। ওই সন্ত্রাসী কিরিচ নিয়ে রাস্তায় অবস্থানের পাশাপাশি ক্রমাগত হুমকি–ধমকি দেয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পরপর একাধিক শিপইয়ার্ডে এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৩ জুন সীতাকুণ্ডের বানুর বাজার এলাকায় বিএসবিআরএর জরুরি সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির নবনিযুক্ত প্রশাসক ও উপসচিব আবু সাফায়েত মুহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম। সভায় জাহাজ ভাঙা শিল্পে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রশাসকের নেতৃত্বে সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। প্রয়োজনে শিল্পাঞ্চলে নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করা হবে বলেও সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিওবি শিপ রিসাইক্লার্সের মালিক মো. নুরুন নবী মানিক সাংবাদিকদের বলেন, শিপ ব্রেকিং শিল্প এলাকায় এখন বিভিন্ন চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে অ্যাসোসিয়েশনের সভায় সব ব্যবসায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি এবং পুলিশ সুপারের সাথে দেখা করে উদ্বেগ প্রকাশ এবং লিখিত অভিযোগ করেছেন।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। পুরো সেক্টরটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। এরা চিহ্নিত সন্ত্রাসী, অথচ এদের দাপট থামানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন আজ (গতকাল) অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন বলে জানতে পেরেছি।
এ বিষয়ে কথা বলতে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোন করে পাওয়া যায়নি। থানার ডিউটি অফিসার বলেন, এই ধরনের কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। পুলিশ ঘটনাস্থলেও গেছে। কিন্তু সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে এসপি স্যারের সাথে ওসি স্যারের কথা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে।












