চট্টগ্রামে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। নগরীর ও জেলায় প্রতিদিনই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত বা নিহতের ঘটনা ঘটছে। বেপরোয়া গতি, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো বা চড়া এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ।
বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আজাদীকে জানান, গত জুন মাসে চট্টগ্রামে ছোট–বড় ১১২টি দুর্ঘটনায় ১১৮ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই মোটরসাইকেলে প্রাণহানি। সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্ঘটনার পেছনে শুধু মোটরসাইকেল দায়ী নয়, বেপরোয়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং পিকআপের কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা বড়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেশি।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক প্রকৌশলী কে এম মাহাবুব কবির আজাদীকে বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির আশঙ্কা বেশি থাকে। কারণ একটি গাড়িতে বডি থাকে, যাত্রীরা গাড়ির বডির ভেতরে থাকেন। দুর্ঘটনা ঘটলে প্রথমে বডিতে আঘাত লাগে। আর দুটি চাকার উপর মোটরসাইকেল যখন চলে একটু ধাক্কা লাগলেই পড়ে যায়। তাতে মারা যেতে পারে, আহতও হতে পারে। তাই মোটরসাইকেল চালানোর সময় সতকর্তা অবলম্বন করা জরুরি। বিশেষ করে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি না চালানো এবং হেলমেট পরা। অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাইক চালাতে না দেওয়া। ড্রাইভ না জেনে যত্রতত্র গাড়ি চালানোর কারণে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে।
সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল ও ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। গতির প্রতিযোগিতা হয় সড়কে। এছাড়া চালকদের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ট্রাফিক আইন মানতে চান না কেউ।
বন্দর থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে পতেঙ্গা আউটার লিংক রোডে একটি বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। ১ জুন ফটিকছড়িতে বাস চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা ও ছেলে নিহত হন। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। ২ জুন কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকায় দ্রুতগামী পিকআপের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী বাবা ও ছেলে নিহত হন।
মইজ্জ্যারটেক ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ আবু সাঈদ বাকের জানান, সড়কে কিছু কিছু মোটরসাইকেল এবং পিকআপের বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে নিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন চালানোর জন্য আমরা সচেতন ড্রাইভারদের করি।
এদিকে ২৪ জুন রাতে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মীরসরাইয়ের বারইয়ারহাট পৌর এলাকায় কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মো. আলী নামে এক ব্যববাসী নিহত হয়েছেন। ২৫ জুন নগরীর মুরাদপুর এলাকায় কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী রাউজানের শিক্ষক দম্পতি নিহত হন। ২৬ জুন সীতাকুণ্ডের মাদামবিবিরহাট এলাকায় মাইক্রোবাসের ধাক্কায় মো. মহিউদ্দিন নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।
২৭ জুন নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় একটি গাড়ির ধাক্কায় মোটরসাইকেলের পেছন থেকে ছিটকে পড়ে সুমি আক্তার রামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়। ২৮ জুন বোয়ালখালীর কধুরখীল জামতল এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে মো. জাবেদ নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।
সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের সড়কগুলোতে মোটরসাইকেল ও ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। সড়কে গতির প্রতিযোগিতা হয়। এছাড়া চালকদের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ট্রাফিক আইন মানতে চান না কেউ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আজাদীকে বলেন, বেপরোয়া গতি ও অদক্ষ ব্যক্তি গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।
চট্টগ্রামে হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের বিভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। অনেক গাড়ি চালক এসব নিয়ম না মেনে গাড়ি চালান। এছাড়া হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক নিয়ম না মানা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোয় দুর্ঘটনা বাড়ছে।
দুর্ঘটনা বৃদ্ধির প্রধান কারণসমূহ : অতিরিক্ত গতিতে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য গাড়ি চালানো, তরুণ ও কিশোরদের মাঝে উচ্চ গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
ট্রাফিক নিয়ম না মানা : সিগন্যাল অমান্য করা, ওভারটেক করার নিয়ম না জানা এবং উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।
ত্রুটিপূর্ণ রাস্তা ও যানবাহন : চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংযোগ সড়ক (ফিডার রোড) ও মহাসড়কে ভারী যানবাহনের চাপ এবং বেহাল সড়কের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়া রাস্তা দিয়ে চলাচলে গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে।
সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব : চালক ও আরোহী উভয়েরই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা এবং অনেক সময় মোটরসাইকেল চালকের হেলমেট থাকলেও পেছনের যাত্রীর হেলমেট থাকে না।
প্রাণহানি রোধে করণীয় : ট্রাফিক এবং হাইওয়ে পুলিশের মতে, সড়কে গাড়ি চালানোর সময় সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। সচেতনতাই সড়ক ও মহাসড়কে প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব। সড়কে গাড়ি চালানোর ব্যাপারে ড্রাইভারদেরকে গতি নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ করা।
আইন প্রয়োগ : সড়কে মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা, লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালানো বন্ধ করা।
অভিভাবকদের সতর্কতা : অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া থেকে বিরত থাকা।












