স্বাস্থ্য খাতের খারাপ চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে রিসেট করতে হবে

চমেক হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড উদ্বোধনে আমির খসরু

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৫ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য খাতে কিছু খারাপ চর্চা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুরো প্রক্রিয়াকে ‘রিসেট’ করতে হবে। গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। উপস্থিত ছিলেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন। সভা শেষে অর্থমন্ত্রী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন চালু করা পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড উদ্বোধন ও পরিদর্শন করেন। হাসপাতালের ১৬ নং ওয়ার্ডে শুধুমাত্র ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নতুন এ ওয়ার্ড চালু করা হয়। এর ফলে সরকারি পর্যায়ে ডেঙ্গু চিকিৎসা সেবাদান আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। ডেঙ্গু রোগীদেরও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি আরো দ্রত ও সহজ হবে।

স্বাস্থ্য খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এবারের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বাধিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা অর্থ ব্যয় করলেই পরিবর্তন আসবে না। সেবার মান বাড়াতে প্রশাসনিক ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। আমরা চাই এ টাকাগুলো যেখানে বিনিয়োগ হবে এটার প্রতিদান দেশের মানুষ ও দেশ পেতে হবে। এটার অ্যাবসেন্স অনেকদিন ছিল, অনেক দুর্নীতি হয়েছে, প্রচুর অব্যবস্থাপনা হয়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। এ জায়গায় আপনারা একটু মনোযোগী হোন।

তিনি বলেন, শুধু অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, সেই বিনিয়োগের সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্যসেবায় গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেবে, অবকাঠামো উন্নয়ন করবে। কিন্তু সেবার মানোন্নয়নের দায়িত্ব চিকিৎসক, প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবাসংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করে হাসপাতাল পরিচালনা ও চিকিৎসাসেবায় গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিজস্ব পরিকল্পনা ও সুপারিশ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। শুধু বিনিয়োগ দিয়ে পরিবর্তন আসে না; প্রয়োজন পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ছিল। বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নজিরবিহীন বিনিয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নই সরকারের মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত প্রভাব এবং অতীতের আর্থিক দায় বহন করেও সাহসী ও জনকল্যাণমুখী বাজেট প্রণয়ন করেছে। এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই বরাদ্দের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যাতে দেশের মানুষ এর প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারে।

খসরু বলেন, প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে এখন চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছেবিনিয়োগের যথাযথ প্রতিফল, প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত বিষয়। অতীতের মতো দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, বরং জনগণের সর্বাধিক উপকার নিশ্চিত করবে এমন প্রকল্পেই সরকার বিনিয়োগ করছে।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর হলে মেডিকেল কলেজ ও বড় হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং উন্নত চিকিৎসাসেবা দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরজুড়ে মশক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভা ধ্বংস এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদেরও সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু হওয়ায় রোগীরা দ্রুত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাবেন। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজন এবং সেবার পরিবেশ আরো উন্নত করতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

সভায় হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়ন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল সংকট নিরসন এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, হাসপাতাল পরিচালক, বিভাগীয় প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট এ সময় কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহুমকির মুখে জাহাজভাঙা শিল্প
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম হবে লজিস্টিক্যাল হাব