উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার কারণ উদঘাটন জরুরি

| রবিবার , ৫ জুলাই, ২০২৬ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছে না। প্রথম দিনে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডসহ মাদরাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীন মোট ২৪ হাজার ৭৮৪ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার তিন ধারা মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ২৪ হাজার ৯০৪। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১০ লাখ ১ হাজার ১২০ জন। অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডে ১৭ হাজার ২৩৩ জন, মাদরাসা বোর্ডে ৪ হাজার ৪৭৮ এবং কারিগরি বোর্ডে ৩ হাজার ৭৩ জন প্রথম দিনের পরীক্ষায় বসেননি। বোর্ডভিত্তিক অনুপস্থিতির চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ নয়টি বোর্ডের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন ঢাকা বোর্ডে। ঢাকা বোর্ডে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৯৭১ জন অনুপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে শতকরা হারের দিক থেকে বরিশাল বোর্ডে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এ বোর্ডে ১ হাজার ৩৪৬ জন অনুপস্থিত ছিলেন। এছাড়া রাজশাহীতে ২ হাজার ৪৯৭ জন, কুমিল্লায় ১ হাজার ৭৯৫, যশোরে ২ হাজার ৭৮, সিলেটে ১ হাজার ১২৭ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ১ হাজার ১৪২ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, বোর্ডের অধীনে মোট ৭৩ হাজার ৮৬৩ জন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও অংশ নেয় ৭২ হাজার ৫২৩ জন। অনুপস্থিত ছিল ১ হাজার ৩৪০ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ১ দশমিক ৮১ শতাংশ।

প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না, যেটা উদ্বেগজনক। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিবন্ধন করা এত বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ না করা তূলনামূলক এবারই বেশি। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করেনি শিক্ষা বিভাগ। তবে এবার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান। তিনি পত্রিকান্তরে বলেন, এ পরিস্থিতির পেছনে বিদ্যমান লেখাপড়ার পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দুর্বলতা, নাকি পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোনো কারণ কাজ করছেতা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়ে অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত হবে এবং অদক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা দেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর। তাই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

এদিকে, এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছে না, পরীক্ষা সঠিকভাবে হচ্ছে। অভিভাবকরা সহযোগিতা করছেন। সবকিছু মিলিয়ে এবার হয়তো কিছুসংখ্যক ছাত্রছাত্রী চিন্তা করেছে, বিগত দিনের মতো প্রস্তুতি ছাড়া কেউ যেতে পারছে না। সে জন্য বোধহয় হারটি (ঝরে পড়া) বেড়ে গেছে।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এটি খুব খারাপ সূচক (ইন্ডিকেটর)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, এসএসসির পর এইচএসসিতে নির্ধারিত হারে সব সময় শিক্ষার্থী ঝরে যায়। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া অথবা পরিবারের জন্য কাজে যুক্ত হওয়াসেটি ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকত। কিন্তু এবার দেখা গেল মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ, কারিগরিতে ৫৪ শতাংশ ও সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ৩৩ শতাংশ ঝরে গেছে। এটা বড় সংখ্যা। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। ধারণা করা হয়, দারিদ্র্যের কষাঘাত, পারিবারিক বিপর্যয় এবং শিক্ষাসামগ্রীর দুষ্প্রাপ্যতা অনেককে ঝরে পড়তে বাধ্য করছে। তাছাড়া সামপ্রতিক অস্থিরতার কারণে এবং মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় অনেকের মাঝে পরীক্ষাভীতি তৈরি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে কেন শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন জরুরি। ঝরে পড়া রোধে কাউন্সেলিং, বৃত্তি প্রদান এবং শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ ও মানসিক সাহস জোগাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে