তারপরও ঐ ব্যবসার পুরোটাই যেহেতু ইন্সটিউশনাল, প্রথমেই বসেছিলাম, তা নিয়ে তাই তালাতের সাথে। বলেছিই তো যে, তার সাথে দুইতিনবার বসেও পাচ্ছিলাম না কোন কূল কিনারা। এদিকে উড়ছিল সময় রকেট গতিতে। এমতাবস্থায় কপাল ভাল যে মনে পড়েছিল, কথায় কথায় একদিন মোহাম্মেদ গা’র বলেছিল, আমাদের ডিসট্রিবিউটরের, টেন্ডার বিজনেস হেড নাহরাওয়ির কথা। তার মতে ২০ বছরের হাতে কলমের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মিশরি নাহরাওয়ির নাকি সৌদি ইন্সটিটিউশনাল বিজনেসের জীবন্ত এনসাইক্লপেডিয়া। সে কথা মনে পড়তেই দ্বারস্থ হয়েছিলাম তার। এছাড়াও কপাল ভাল যে, বিজনেস মডেল বদল নিয়ে, এই দালানের দুই অংশের, কান্ট্রি অফিস ও ডিসট্রিবিউটর অফিসের মধ্যে চলমান ঠাণ্ডা যুদ্ধ, উপেক্ষা করে এখানে আসার পর থেকে নিরন্তর চেষ্টা করেছিলাম ঐ অফিসের সিইও, সুইস ব্রুনো সাফিনোর সাথে ভাব জমাতে।
বিষয় হচ্ছে ফিলের নেতৃত্বে দালানের এ পাশে বছর দুয়েক আগে কান্ট্রি অফিসের গোড়াপত্তন হলে, সৌদি ডিসট্রিবিউটর খোদ বাসেল থেকে আমদানি করেছিল, ব্রুনোকে। কান্ট্রি অফিসকে টেক্কা মারার জন্য। ব্রুনো যে শুধু সুইস তাইই নয়। আছে তার আমাদের হেডকোয়ার্টারে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। বিস্তৃত তাই তার নেটওয়ার্ক। সমস্যা হয়েছে তাতে আমাদের মতো উলুখাগড়াদের। কারণ তার উপস্থিতিতে, এখানকার অবস্থা দাঁড়িয়েছিল “এক ঘর মে দো পীরঃ, সম্পর্ক যাদের এক্কেবারে দা কুমড়া!
অন্যদিকে মরুতে এসে এ বাঙ্গাল তো পড়েছিলাম শুরুতে অকুল পাথারে। ফলে খড়কুটো যাই পাচ্ছিলাম, তাই আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় ছিলাম। বসকে বলেছিলাম তাই, আর কিছু না হোক অপারেশনাল অনেক কাজের জন্যই তো নির্ভর করতে হয় ডিসট্রিবিউটরেই উপর। এমতাবস্থায় ব্রুনোর সাথে যদি মাঝে মধ্যে চা কফি খাই, সুবিধা হবে। আপত্তি আছে কী তার?
স্বভাবগত উচ্চহাসিতে জানিয়েছিল, কোনই সমস্যা নাই তার। তবে তার ধারনা, ঘুঘু ঐ সুইস বুইড়া মোটেও পাত্তা দেবে না। ঠিকই বলেছিল ফিল। প্রথম প্রথম পাত্তা তো দেয়ই নি, বরং ভদ্রভাবে অপমান করে এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু ততদিনে ঐবিষয়ে সৌদিরা চামড়া আমার যথেষ্ট পুরু করে ফেলায় সুবিধাই হয়েছিল! ধরেছিলাম তাই রবার্ট ব্রুসপণ। সেই নিরন্তর চেষ্টার মধ্যেই লক্ষ্য করেছিলাম, পেশাগত কাজ নিয়ে কথা বলতে গেলেই, মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায় ব্রুনোর। কিন্তু মরুভূমি নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ তার, অপার!
বিষয় হচ্ছে এরই মধ্যে, পাকিংলটে যতবারই দেখেছি তার দৈত্যাকার ল্যান্ডক্রুইজারটি, ধুলোয় ধূসরিত অবস্থায়ই দেখেছি সেটিকে সবসময়। নানান রঙয়ের বালির রঙয়ের আস্তরণে মূল রং ঢাকা পড়া গাড়িটিকে দেখলেই মনে হয়, বিশালাকায় এক আরবি ঘোড়া মরুবালিতে গড়াগড়ি দিয়ে মাথা গুছেছে এইমাত্র পার্কিংলটের শীতল ছায়ায়।
তা নিয়ে নানানজনের সাথে কথা বলে জেনেছি, সুইস আল্পস থেকে নেমে আসা ব্রুনোর তুমুল মরুপ্রীতির কথা। কবিগুরুর মতো সুইস কোন কবির “হতাম যদি আরব বেদুঈন” কবিতাতেই অনুপ্রাণিত হয়েছে কী না, ষাটোর্ধ ছিপছিপে গড়নের ব্রুনো, কে জানে? ভাবেসাবে তার মনে হচ্ছে, এখানকার নিঃসঙ্গ সময়কে রাঙ্গিয়েছে সে মরুতে সুইস বেদুঈন হয়েই। সাপ্তাহিক ছুটিতে অবশ্যই, এমনকি আর সব দিনেও যখনই সুযোগ পায়, গাড়ী নিয়ে দেয় সে ছুট মরুতে।
সে কারণেই একদিন চা খেতে খেতে তুলেছিলাম ঐ প্রসঙ্গ। গলেছিল তাতেই নিমিষে দুজনের মাঝখানের প্রাচীরসম জমাট বরফ। আজকাল তো আমাকে দেখলে নিজ থেকেই ডাকে সে কফি খেতে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বুঁদ হয়ে বলতে থাকে তার মরুএডভেঞ্চার কাহিনী। অতিঅবশ্যই এবিষয়টি যুযুদ্ধমান দুই অফিসের কারোরই নজর যে এড়ায়নি, তা বলাই বাহুল্য। এদিকে তার সাথে আলাপ জমানোর ফাঁক ফোঁকড় দিয়েই বুঝেছি, এখানে তার দুই হাতের একহাত হল টেন্ডার বিজনেস হেড নাহরাওয়ি। দ্বিতীয়টি সাপ্লাই চেইন হেড, প্যালেস্টানি আলা ফাতেহ আতিয়া।
অতএব ব্রুনোর মরুগল্প শোনা শেষে তাদের অফিসেও দিয়েছি উঁকি। তাতে, এখন পর্যন্ত ফাতেহের বরফ না গলাতে পারলেও, হয়েছে লাভ অবশ্যই। বেহুদা ঝামেলা তৈরি করার ব্যাপারে সর্বক্ষণ ওত পেতে থাকা ফাতেহ, কিছুটা হলেও বাদ দিয়েছে উটকো ঝামেলা করার ফন্দিফিকির। তবে সবচেয়ে ভাল হয়েছে যা, তা হল নিতান্তই শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক নাহরাওয়ির কাছ থেকে ভালই সহায়তা পেতে শুরু করেছিলাম। তুমুল দ্রুততায় ভ্যাক্সিন টেন্ডার জিতে সাপ্লাই ও নিশ্চিত করা গেছে তারই কারণে। নাহরাওয়ির সাথে কথা বলতে বলতেই বুঝেছি, তার কাছে তালাত শিশুসম। বেহুদা আওয়াজই বেশী তার। এ বিষয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দুটোই তার ভাসা ভাসা। সমস্যা হল ঐ ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে সে এমন আওয়াজ দিয়ে বেড়ায়, মনে হয় যেন সে এক বিরাট বিদ্যার জাহাজ। এছাড়া যে কোন সরল ব্যাপারকে অকারন জটিল করে তোলাই যে তার মজ্জাগত, বুঝেছি তাও। এই বোধদয়ের কারণে একটানা তিনদিন নাহরাওয়ারির সাথে বসে, ভ্যাক্সিনের হজ সাপ্লাই নিশ্চিত করেছি যখন, তালাত ছিল তখন জেদ্দায় ট্যুরে। রিয়াদ ফিরে যখন শুনেছে সে, ঐ সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, ভড়কেছে তুমুল, বেচারা। তদুপরি এর আগে তার তুলনায় ঢের চোখা ও স্মার্ট জর্ডানি বাসেমকে যে বের করে ফেলেছি তার মিশরি মার্শাল ল থেকে, সেটাও সম্ভবত পছন্দ হয়নি। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, তার অনুপস্থিতিতে ভ্যাক্সিন টেন্ডার ফাইনাল হয়ে যাওয়ায়, ওটা যে হয়েছে তার ম্যাজিকে এমন দাবী তো সে করতে পারছে না, বড় গলা করে ফিলের কাছে। সেটাই সম্ভবত কারণ তার ঐ বুকভাঙ্গা কান্নার।
নাহ, থাক ওসব ভাবনা মুলতবি আপাতত। যাই এখন এইচ আর হেড গিউসির কাছে। ফিল যেহেতু যে ক’জন লোক চেয়েছি তা দেয়ার ব্যাপারে রাজী হয়েছে, দ্রুতই সে সব পদ পূরণ করতে চাই।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।












