এবার মরুতে ফের পা ফেলার পর, জিয়াই যথারীতি এয়ারপোর্ট থেকে পিক করেছিল। তারপর সোজা নিয়ে গিয়েছিল তার ডেরায়। জম্পেশ খাওয়া দাওয়ার সাথে তাতে, ঈদোত্তর আড্ডাও হয়েছিল তাতে। বলেছিলাম তখনই ভাবীকে আসতে আজ এখানে।রাজীও হয়েছিল দুজনেই। কিন্তু গতকাল ফের জিয়াকে তার দাম্মাম অফিসে ছুটতে হওয়ায় পরিকল্পিত সেই আড্ডাটি ভেস্তে গেছে। লাগছে ফাঁকা ফাঁকা বিকেলটা তাই। সাঁতার শেষে বসবো টেড প্লাটফর্মে, ভার্চুয়াল আড্ডায়।
কী ব্যাপার? ফোন করলো কে? নম্বর তো দেখছি সৌদি। কিন্তু নাম তো উঠেনি কোন? অচেনা কেউ কি রং নাম্বার করলো নাকি? চায়ের পানি চুলায় চড়াতে গিয়েও না চড়িয়ে ধরলাম ফোনটাই আগে–
“হ্যালো, আপনি কি সেলিম?”
অচেনা সৌদি নম্বর থেকে আসা ফোনের ওপাশ থেকে এরকম খাস বাংলা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও। থতমতই খেয়ে গেলাম কিছুটা তাই। এক সাথে যে ভঙ্গিতে পরিচয় জিজ্ঞেস করলো লাগলো না সেটাও ভাল। বিরক্তি চেপে বললাম
হ্যাঁ, সেলিম সোলায়মান বলছি। আপনি কে ভাই?
“আপনার শ্বশুরবাড়ি কি ঠাকুরগাঁও? মানে আপনি কি লাজুর হাসবেন্ট?”
সসভ্রমে দ্রুত বললাম, হ্যাঁ , হ্যাঁ। শ্বশুরবাড়ির এলাকার লোকজনকে যথাবিহিত সম্মান না করলে খবর আছে। মধুর স্বরে বললাম, তা আপনাকে যে কি বলে ডাকবো বুঝতে পারছি না।
“শোনেন, সুমন মানে আপনার শ্যালকের কাছ থেকে এই নম্বরটা পাইলাম। আমার বাড়ি ঠাকুরগাঁও। ঈদের ছুটি কাটাইয়া আসলাম তো। আপনার শ্যালক আমাদের ছোট ভাইয়ের মতো। আমার বাড়ি আশ্রম পাড়ায়। লাজুও আমাকে চিনে।“
আসালামু আলাইকুম। নামটা একটু বলবেন ভাই?
“বাচ্চু। বাচ্চু বললেই চিনবে লাজু। ওদের সিনিয়র আমি। একসময় গানের দলে গিটার বাজাইতাম তো। ঠাকুরগাঁওয়ের নর্দানস্টার ব্যান্ডের নাম শুনছেন? এখানে আছি অনেকদিন। ইদে দেশে গিয়া শুনলাম আপনিও আছে। কী করতেছেন এখন? চইলা আসেন। আমার গাড়ী আছে। গাড়ী নিয়া ঘুরামু আপনেরে।”
অনেক ধন্যবাদ ভাই। চা বানামু ভাবছিলাম। আপনে যেহেতু অনেকদিন আছেন, তাইলে তো রিয়াদ খুব ভাল চিনেন। আর গাড়ী যেহেতু আছে আপনিই চলে আসেন এখানে। তারপর দুইজনে চা খাইতে খাইতে গল্প করা যাবে। নিজ থেকে খোঁজ নিলেন, সে জন্যও ধন্যবাদ আবারো। “কী করেন এখানে?” এই একটা কোম্পানিতে আছি আর কি। “কোন পোস্টে আছেন? আরবি জানেন?” মার্কেটিং হেড। না আরবি জানি না। “ওহ তাই নাকি? আমিও তো মার্কেটিংহেড। তাড়াতাড়ি আরবি শিখা নিয়েন। নাইলে মার্কেটিং করবেন কিভাবে এখানে?” সেজন্যই তো বললাম, যদি বাসায় আসতেন, খুব ভাল হইতো। আমি তো আরবি জানি না। রিয়াদও খুব ভাল চিনি না। বাসায় আসলে চা খেতে খেতে আড্ডা দেয়া যেত। ফাঁকে ফাঁকে মার্কেটিঙয়ের টিপস নিতে পারতাম আপনার কাছ থেকে। ‘এতো কইরা বলতেছেন যখন, ঠিক আছে। ঠিকানা বলেন।’ বিস্তারিত ঠিকানা শুনে, চাইলেন লোকেশন। পড়লাম তাতে ঝামেলায়। প্রথমত লোকেশন বোঝার জন্য, নানান জায়গার নাম বলে জিজ্ঞেস করেন উনি, ঐখান থেকে কি উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব নাকি পশ্চিমের রাস্তা ধরতে হবে? পড়ি আমি অকুল পাথারে।
প্রথমত ঐ সব জায়গার নাম কখনো শুনি নাই। তদপুরি হইলাম তো আজন্ম দিককানা। কোন জায়গার লোকেশন বলতে গেলে, ঐ এলাকার কোন একটা ল্যান্ডমার্ক ধরে বলি ডানে যেতে হবে না বাঁয়ে যেতে হবে। ফলে বাংলাতে কথা হলেও হয়ে যাচ্ছিল দু জনের দুই ভাষা।
মিনিট পাঁচেকের লোকেশন বিষয়ক ধস্তাধস্তির ভজঘট থেকে বের হবার জন্য অতঃপর বললেন উনি, ‘এককাজ করেন, ট্যাক্সি ধরে আপনিই চলে আসেন সোলায়মানিয়ায়। নাম করা জায়গা। আপনিও চিনেন নিশ্চয়।ওইখানেই থাকবো। তারপর আমার গাড়ি নিয়ে যাব আপনার বাড়ি।’
হুম, নাম শুনছি জায়গাটার। তবে ঠিক কোন সে জায়গা নিশ্চিত না তা। আচ্ছা ঐটা তো মনে হয় মামলাকা টাওয়ার পার হওয়ার পর, বামে টার্ন নিলে যে তাহলিয়া স্ট্রিট আছে, ঐখানে? তাই না? ‘আরে মামলাকা টাওয়ারের পিছনে আমারও অফিস। ওইখান থেকে কাছেই সোলায়মানিয়া।’ বলেই ফের শুরু করলেন সেই উত্তর দক্ষিন পূর্ব পশ্চিম ঈশান বায়ু নৈঋত। দ্রুত তাকে থামিয়ে, ঐ এলাকার নামকরা লেবানিজ রেস্টুরেন্টে সামনে থাকতে সবিনয় অনুরোধ রাখলাম। চিনলেন তিনি। পৌঁছানো গেল তাই মতৈক্যে। অতপর চা বানানো স্থগিত করে, দ্রুত বাইরে বেরুবার জন্য পোশাক পাল্টাতে লেগে গেলাম শুরু।
একেতো শুক্রবারের বিকেল, তদপুরি রিয়াদ এখন ইদ উদযাপন শেষে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেনি, বিশ তাই মিনিটেই গেলাম পৌঁছে অকুস্থলে। সামনে পার্কিংস্লট খালি আছে কি না কে জানে? এখানেই যেহেতু একটা খালি স্লট পেলাম, পার্ক করি এখানেই। খুব তো দূর না। পার্ক করা শেষে গাড়ী থেকে বেরিয়ে দূর থেকেই চোখে পড়লো রেস্টুরেন্টের শেইডে ক্যাপ পড়া বাদামি গাত্রবর্ণের একজনকে। ধরে নিলাম উনিই বাচ্চু ভাই। এখানে তো খোলা জায়গায় কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না বেহুদা।
তারপরও নিশ্চিত হবার জন্য এগুতে এগুতে ফোন করলাম। ফোন ধরেই উনি ডানে বাঁয়ে তাকাতে শুরু করলে, হাত নাড়িয়ে জানান দিলাম উপস্থিতি।
‘বুঝলেন, এটা তো বাংলাদেশ না যে রাস্তায় গল্প করা যাবে। দেরী আর না করি। চলেন রওয়ানা করি আপনার বাসায়।’ হাত মেলাতে মেলাতে উনি বলতেই বলি–কিছুক্ষণ পরেইতো এই রাস্তায় শেখের ছেলেরা, ফেরারি, লাম্বারগুনি, বেন্টলে, এস্টনমার্টিন, হামার নিয়ে রেসিং শুরু করবে। বন্ধের দিনে ভুলেও আসি না তাই এদিকটায়।
‘এই এই কই যাইতেছেন আপনি? বললাম না গাড়ি আছে আমার।’
না মানে, ভাবতেছি তাইলে আমার গাড়িটা কে নিয়ে যাবে? আপনি বরং আমার পেছন পেছন আসেন? “ওহ গাড়ী আছে নাকি আপনার! কোথায়? কোথায়? দেখি তো?” ঐ তো ঐখানে পার্ক কইরা আসছি।
“ওহ ! এইটা আপনার?”কড়া রোদে ঘাড় নামিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা বিশালকায় উটের মতো গাড়িটির চারদিকে চক্কর দিতে দিতে প্রশ্ন করেন, কোম্পানির গাড়ী। আমার নামে বরাদ্দ আর কি!
‘অনেক বড় কোম্পানি নাকি? একদম ব্র্যান্ডনিউ! আমি অবশ্য যেদিন যেটা ইচ্ছা সেটাই চালাই। আজ আনছি টয়োটা করোলা। একটু পুরান আর কী।’ চলেন চলেন রওয়ানা করি। ড্রাইভার আমি মোটেও ভালো না। পার্কিং থেকে বের হতে সময় লাগবে। এই ফাঁকে নিয়া আসেন আপনার গাড়ী। চালাইও আমি ধীরে। ঠিক আছে। ঠিক আছে। বলে বাচ্চু ভাই ঘুরে রওয়ানা করলেন তার শকটের দিকে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।












