রাজধানী ঢাকার পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার একটি আদালত। এর ফলে নৃশংস ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করল বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে আদালত সোহেল রানাকে ৫ লাখ ও তার স্ত্রীকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক রোববার এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত পরিষ্কারভাবে বলেছে অটোপসি রিপোর্টে চিকিৎসক বলেছেন ভিকটিম রামিসার দেহে ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। ট্রাইব্যুনাল অতি দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণা করেছেন’। তিনি বলেন, ‘আদালত রায়ের শুরুতে বলেছেন শিশুদের অধিকার বা শিশুদের রক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর একটি। অপরাধ হলে কোনো দয়া দাক্ষিণ্য না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তারই নিমিত্তে ট্রাইব্যুনাল অপরাধীদের মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করেছেন’।
শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলার রায়টি কোন প্রক্রিয়ায় কবে কিভাবে কার্যকর হবে সেই আলোচনা সামনে এসেছে। আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, উচ্চ আদালতে এই মামলার নিষ্পত্তি যাতে দ্রুততম সময়ে করা যায় সেজন্য তিনি ও অ্যাটর্নি জেনারেল মিলে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন যে, রামিসা হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স যাতে শুনানির জন্য এগিয়ে আনা যায় সেজন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের দৃষ্টিতে আনার উদ্যোগ নেবে সরকার। ওদিকে মামলার রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছাড়াও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামি পক্ষের আইনজীবীও। মামলার বাদী রামিসার পিতা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেছেন, রায়ে তারা সন্তুষ্ট হয়েছেন, তবে রায় কার্যকর হলেই তাদের প্রত্যাশা শতভাগ পূরণ হবে।
মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিরাজদিখানের এলাকাবাসী। একইসঙ্গে তারা দ্রুত রায় কার্যকরের জোর দাবি জানিয়েছেন। রায়ের পর মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, বহু প্রতীক্ষার পর এ রায় ঘোষণায় তারা সন্তুষ্ট হলেও দ্রুত তা কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের মতে, এমন জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত শাস্তি কার্যকর হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমবে এবং অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে। রামিসার আত্মীয়রা বলেন, আমরা আমাদের সন্তানকে আর ফিরে পাব না। তবে দ্রুত রায় কার্যকর হলে অন্তত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আমাদের সন্তানের আত্মা শান্তি পাবে।
‘যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব’, ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন আদালত। পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আদালত বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা ‘বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ’। মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এ মামলায় তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে তদন্তকারী সংস্থা অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। একইভাবে প্রসিকিউশন মামলার সব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আদালতের সমক্ষে উপস্থাপন করে বিচারকার্য দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের এ মামলা কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়, এটি আমাদের সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের ঘৃণার চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই। ধর্ষকের পক্ষে যেন কোনো উকিল না দাঁড়ায়, সেটা দেখা দরকার। প্রশ্ন উঠতে পারে, তা হলে কি অপরাধী আইনের সহায়তা পাবে না! এমন কিছু অপরাধ আছে, যা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, অপরাধীরা প্রকাশ্য। সেখানে তো আইনের সহযোগিতা না পাওয়াই উচিত। প্রয়োজন যুগপৎ সচেতনতা, জাগরণ, প্রতিরোধ ও শাস্তি। চেষ্টা করতে হবে যেন আমাদের সন্তানরা ধর্ষক না হয়ে ওঠে, আর চেষ্টার পরও যদি তারা ধর্ষক হয়, তা হলে আইনের শাস্তি কার্যকর করতে হবে।








