ফুটপাত দখল যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিনিয়ত দখল চলছেই। নগরবাসীর অব্যাহত আপত্তি এবং সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নিরন্তর অভিযান– এসব কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না দখলদারদের দৌরাত্ম্য। এমনও অভিযোগ আছে যে খোদ সিটি কর্পোরেশনের প্রশ্রয়ে ফুটপাত দখল করে নানা স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। গত ৪ জুন দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে ‘ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের একাংশও হকারের দখলে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, ‘নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোর ফুটপাত দখল করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলছে। ভ্যানগাড়ির দৌরাত্ম্যে গাড়ি চলাচল ব্যাহত তো হচ্ছেই, পায়ে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে উঠছে। আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, জামালখান মোড়, আন্দরকিল্লা, নিউ মার্কেট, বহদ্দারহাট, চকবাজার, কোতোয়ালী, ইপিজেডসহ নগরের প্রায় প্রতিটি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত নিয়ে চলছে ভাগবাটোয়ারা। শুধু ফুটপাত নয়, একইসাথে সড়ক দখল করেও চলছে বিকিকিনি। ফুটপাতে হকার বসিয়ে, সড়কে অবৈধ গাড়ির স্ট্যান্ড কিংবা ভ্যান গাড়ির ভাসমান বাজার বসিয়ে আদায় করা হচ্ছে টাকা। বিভিন্ন গ্রুপ নামে–বেনামে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে কোটি কোটি টাকা আদায় করছে। প্রভাবশালী নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ফুটপাত ও রাস্তা দখলের অপতৎপরতা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নগরজুড়ে রাস্তা এবং ফুটপাত দখলের ঘটনা চরম আকার ধারণ করেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে প্রভাবশালী চক্রের ব্যবসা চলছে। দখল করা ফুটপাত এবং রাস্তায় ভাসমান ভ্যান এবং হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়। এই টাকা ভাগ হয় নানাভাবে। প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় থাকায় দখলদাররা ক্রমে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ফুটপাতে হকাররা নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে। ভ্যানেও থাকে নানা পণ্য। ফুটপাত এবং রাস্তায় বিকিকিনি চালানোর ফলে মানুষের হাঁটাচলা এবং রাস্তায় গাড়ি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
আসলে জনসাধারণের চলাচলের জন্য রাস্তার দু’পাশে যে ফুটপাত রয়েছে, তাতে হাঁটতে পারা পথচারীর নাগরিক অধিকার। কিন্তু ফুটপাতে হাঁটার সেই অধিকারও কেড়ে নিয়েছে অবৈধ দখলদার। যদিও এই ফুটপাত তৈরি হয় জনগণের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য। অথচ কিছু মানুষ এই ফুটপাতের হাঁটার জায়গায় দোকান বসিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কিছু প্রভাবশালীর সহযোগিতায়। প্রশাসনের নাগের ডগায় এসব পণ্যের পসরা সাজিয়ে কোনো রকম তোয়াক্কা না করেই ফুটপাত বন্ধ করে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। আমাদের ফুটপাত ও সড়ক দখল করে দোকান বসানো যেন একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হকারদের দখলে থাকা ফুটপাতে চলাচলে প্রতিবন্ধকতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে গাড়ি চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বাইরে পথচারীদের চলাচলের জন্যই ফুটপাত। ফুটপাত শুধু রাস্তা বা সড়কের সৌন্দর্যই বাড়ায় না– পথচারীদের নিরাপদে হাঁটতে সাহায্য করে। প্রশস্ত ফুটপাতের কারণে যানজট বা দুর্ঘটনাও কমে অনেক। ব্যস্ত নগরীকে যানজটমুক্ত রাখতে স্বল্প দূরত্বে হেঁটে চলারও কোনো বিকল্প নেই। সেই ফুটপাত দেখভালের দায়িত্বও প্রশাসনের। কেউ ফুটপাত দখল করলে উচ্ছেদের দায়িত্বও তাদের। তাঁরা বলেন, ফুটপাতে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালালেই হবে না। পুনরুদ্ধার হওয়া ফুটপাত পুনর্দখল রোধে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। প্রয়োজনে মিনি বাগান করে দিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে উচ্ছেদের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা জায়গা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় উচ্ছেদ করেও কাজ হবে না। কেউ কেউ ফুটপাতের পরিবর্তে বিকল্প স্থানে হকারদের বসার জায়গা করে দেয়ার পরামর্শ দেন।
অভিযোগ আছে, ফুটপাত একটি পক্ষের একটি মধুচক্র। এই মধুচক্রে রক্ষিত টাটকা মধুর লোভ সংবরণ করা কঠিন। প্রশাসনের লোকজন এ লোভ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারেন না। ফুটপাত যেহেতু হেঁটে চলাচলের জন্যই। তাই পথচারীদের এই নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা পাওয়া জরুরি। তারজন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে চালাতে হবে নিয়মিত অভিযান। আমরা চাই দখলমুক্ত ফুটপাত। তারজন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কঠোর ও দ্রুত ভূমিকা গ্রহণ আবশ্যক।








