বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক, গবেষক, চিন্তাশীল লেখক এবং সুবক্তা বিশেষ করে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন তাত্ত্বিক গবেষকের নাম অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক।
৩ নভেম্বর ১৯৪৮ সালে ফরিদপুরের মধুখালী গ্রামে মাহবুবুল হকের জন্ম। তাঁর পিতার নাম আবদুল মালেক মোল্লা, মাতার নাম মোসাম্মৎ হাজেরা খাতুন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল হতে ১৯৬৪ সালে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক এবং একই কলেজ হতে ১৯৬৯ সালে বাংলায় বি,এ এবং ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় এম. এ পাশ করেন।
ড. মনিরুজ্জমানের তত্ত্বাবধানে তিন জন আধুনিক কবি ‘সমর সেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও সুকান্ত ভট্টাচার্য্য এর বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৯৭ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন।
স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখির শুরু। অষ্টম শ্রেণিতে ‘নবদিগন্ত’ নবম ও দশম শ্রেণিতে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল বার্ষিকী সম্পাদনার মাধ্যমে সম্পাদনায় হাতেখড়ি।
১৯৬৪ এর দ্বিমাসিক সাহিত্যপত্র ‘কলরোল’ সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকাতেই একুশের প্রথম আলেখ্য–ঔপন্যাসিকতা–সেন রচিত ‘লাল রং পলাশ’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৭ তে ‘মিছিল’, ‘অন্বেষা’, ‘পদাতিক’, ‘রবিকরে কবিকণ্ঠ’; ১৯৭৯ তে ‘সাহসী ঠিকানা’, ১৯৮১ তে চিটাগাং গাইড’, ১৯৯৫ এ ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’, ১৯৯৭ ও ২০০১ এ ‘আজিকে এ আকাশ তলে’ সম্পাদনা করেন। আবুল ফজল, আবদুল হক চৌধুরী, ওহীদুল আলম প্রমুখের প্রয়াণ স্মরণপত্র সহ বহু স্মরণিকা ও সংকলন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সামপ্রতিক সম্পাদনার মধ্যে বিশেষ উল্ল্লেখযোগ্য নোবেলজয়ী মোহাম্মদ ইউনুস সংবর্ধনা স্মারক (২০০৭) এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার উপর গবেষণামূলক প্রবন্ধ এবং লোকমান খান শেরওয়ানী স্মারকগ্রন্থ অন্যতম।
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে অধ্যয়নকালে আবৃত্তি, অভিনয়, বিতর্ক, চিত্রাঙ্কন চর্চায় সক্রিয় হন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে সৃজনশীল সাংস্কৃতিক নানা কর্মতৎপরতার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগান। তাঁর পরিচালনায় ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির বটমূলে ছায়ানাট্য ‘লাল রং পলাশ’ এর মঞ্চায়ন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করে। ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বিশাল মিলনায়তনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘লাল রং পলাশে’র মঞ্চায়ন ছিল সে সময়ে ঐ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাড়া জাগানো ঘটনা। চট্টগ্রাম কলেজে সাংস্কৃতিক কর্মতৎপরতার পাশাপাশি মাহবুবুল হক ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। তিনি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ–সভাপতি হিসেবে ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি আগরতলায় একক ও যৌথভাবে একাধিক ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহবুবুল হক দেশ গড়ার গঠনমূলক কাজে সংগঠক হিসাবে দেশ গড়ার ব্রত নিয়ে কাজ করেন। সে সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েও তিনি তাতে সাড়া দেননি। বাংলা একাডেমির গবেষক হিসেবে মনোনয়ন পেয়েও যোগ দেননি তাতে। ১৯৭৬ এ পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবারের হাল ধরতে তিনি চাকরি নিতে বাধ্য হন এবং পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন। কর্মজীবনের শুরু ১৯৭৮ সালে, রাঙ্গুনীয়া কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। ১৯৮১ সালে যোগদান করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগে। ১৯৯৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে অবসর গ্রহণের পর তিনি নোয়াখালী প্রযুক্তি বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন।
জীবনের আলোকিত ও লোভনীয় অনেক হাতছানি থাকা সত্ত্বেও মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকতাকে তিনি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অধ্যাপক মাহবুবুল হকের প্রথম গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘ম্যাক্সিম গোর্কির মা’ ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিভাধর ও জনপ্রিয় সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটি বিশ্বসাহিত্যে এক অসাধারণ সংযোজন। অধ্যাপক মাহবুবুল হক বহুল আলোচিত এবং জনপ্রিয় উপন্যাসটিকে বাংলা ভাষীয় পাঠকদের কাছে অধিকতর হৃদয় গ্রাহী করে তুলে ধরেছেন। এরপর প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণাধর্মী অনন্য গ্রন্থ ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস,’ যা ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যের মৌলিক গবেষক বলে খ্যাত এবং সূবক্তা ড. মাহবুবুল হক শুধু দেশেই নয় বিদেশেও একজন সুবক্তা হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। বাংলা সাহিত্যের এবং চট্টগ্রামের ইতিহাস বিষয়ক গবেষণায় তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য একাগ্রচিত্তে শুনার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর বক্তব্য হতে আমি অনেক কিছু ধারণ করে নিজেকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।
চট্টগ্রামের শিল্প, সাংস্কৃতি ও গবেষণার ক্ষেত্রে একমাত্র প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম একাডেমির’ তিনি একজন সম্মানীত উপদেষ্টা। অধ্যাপক মাহবুবুল হকের দীর্ঘ গবেষণার ফসল ‘বাংলা বানানের নিয়ম’ গ্রন্থটি দেশে বিদেশে বিদগ্ধ পণ্ডিতদের প্রসংশা অর্জন করেছে। এ গ্রন্থে বাংলা গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর মৌলিক চিন্তা চেতনার পরিচয় মেলে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক ড. মাহাবুবুল হকের ১৩টি বই স্কুল পাঠ্য বই হিসেবে মনোনীত এবং ৫টি স্কুল পাঠ্যবই প্রকাশিত হয়েছে। যা দেশে শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম অসাধারণ অবদান হিসেবে বিবেচিত। এ পর্যন্ত তাঁর ১৪টি মৌলিক পবেষণা বিষয়ক প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা বাংলা সাহিত্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান গ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে তিনি মৌলিক গবেষণা বা কঠিন কঠিন সাহিত্য রচনা করেই ক্ষান্ত নন। ছোটদের জন্য তাঁর দায়িত্ববোধ এবং তাঁদের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টা, বোদ্ধামহলের দৃষ্টি কাড়ে। শিশুদের জন্য এ পর্যন্ত তাঁর লেখা ৭টি শিশু কিশোর গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যা শিশুদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ এবং তাঁদের মানষিক মননশীলতা গঠনে তাঁর আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।
প্রবন্ধ ও সমালোচনা বিষয়ে বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৩১ টির অধিক প্রবন্ধ রচনা করেন যা দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়ীকিতে প্রকাশিত হয়েছে।
সমপ্রতি তিনি লোকমান খান শেরওয়ানীকে নিয়ে শামসুল হোসাইনের সাথে যৌথভাবে একটি দুর্লভ বইও সম্পাদনা করেছেন যা বাংলা ইতিহাসের জন্য একটি আকর গ্রন্থ।
অধ্যাপনা, গবেষণা ও সাহিত্যে চর্চার পাশাপাশি তিনি জাতীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন।
ড. মাহবুবুল হক বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, জাতীয় শিক্ষাক্রম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে জাতীয়ভাবে ভূমিকা রেখে আসছেন। এছাড়াও তিনি জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, আর্ন্তজাতিক ভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় যাদুঘর, বাংলাদেশ বেতার, শিল্পকলা একাডেমী ও শিশু একাডেমীর ন্যায় প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর গবেষণা ধর্মী প্রবন্ধ উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি বিদেশেও চরমভাবে প্রসংশিত হয়েছেন। কলকাতা হতে শুরু করে বিশ্বভারতী, দিল্ল্লী সবখানে তাঁর সরব পদচারণা বোদ্ধামহলে চরমভাবে প্রশংসিত হয়ে আসছে।
আমাদের প্রিয় এই মানুষটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলিই ব্যয় করেছেন এদেশের শোষিত বঞ্চিত মানুষদের অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামে। এদেশের ছাত্রদের জন্য একটি অসামপ্রদায়িক বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েমের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলন সংগ্রামে। আজও যা অর্জিত হয়নি। সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে মাহবুব ভাই তাঁর জীবনের তারুণ্য মেহনতি মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। ব্যক্তিগত লাভের জন্য, প্রতিষ্ঠার জন্য কিছুই করেননি, এ ধরনের দৃষ্টান্ত আমাদের পচনশীল সমাজে বিরল। তাঁকে আমরা ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই হারিয়েছি। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাসাহিত্যের গবেষণার যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা অপূরণীয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদক– শিল্পশৈলী












