বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রায় দেড় বছরের রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পর ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে আবারও একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনটি দীর্ঘদিন পর দেশ–বিদেশে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। দেশের নাগরিক এই নির্বাচনকে শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছে।
নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাস অতিক্রম করেছে। তাই মাত্র ছয় মাসের মাথায় বর্তমান সরকারের ভালো–মন্দের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়, কিংবা সেটি এই লেখার উদ্দেশ্যও নয়। তবে যে অভূতপূর্ব প্রেক্ষাপটে এই সরকার দায়িত্বভার তুলে নিয়েছে, তা মনে রাখা প্রয়োজন। বিগত ছয় মাসে নাগরিক হিসেবে যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি হয়েছে, তার আলোকেই এই প্রশ্ন সামনে আসে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান–পরবর্তী জনগণ কি কেবল একটি নতুন সরকার চেয়েছিল? বিখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও লেখক ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের মতে, ‘একটি সফল অভ্যুত্থানের পর যদি শুধু মুখের পরিবর্তন ঘটে কিন্তু ব্যবস্থার পরিবর্তন না হয়, তবে তা বিপ্লব নয়–তা কেবলই ক্ষমতার হাতবদল।’
সেই প্রেক্ষাপটে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। দেশের ছাত্র–জনতা রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু নতুন মুখ দেখতে চায়নি; তারা নতুন রাজনৈতিক আচরণের বাস্তবায়ন দেখতে চেয়েছিল। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বেশ কিছু আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল–ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটে এবং প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতার মূল্যায়ন, প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তবায়ন এবং ব্যক্তিনির্ভর শাসনের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি চালু হোক।
এসবের পেছনে কারণ ছিলো বাংলাদেশের জনগণ গত দুই দশক ধরে একের পর এক রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দলীয়করণ, দুর্বল নির্বাচনব্যবস্থা, ক্ষমতার অতিমাত্রায় কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং দুর্নীতির অভিযোগ– এই সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন সেই দীর্ঘ সঞ্চিত অসন্তোষেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগ গৃহিত হয়। গত প্রায় দেড় বছরের অধিক সময়কাল জনগণ ভাবনা চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছে। যার ফলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তারা প্রার্থী, দল, জোট, ব্যক্তি বা অঙ্গীকারের ভিত্তিতে ভোট দিতে পেরেছে। অবশেষে একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।
নির্বাচনী প্রচারণায় সরকার জবাবদিহিমূলক শাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। একই সঙ্গে তরুণ সমাজ, নারী, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও ছিল তাদের ইশতিহারে।
কিন্তু সরকার পরিচালনার প্রথম কয়েক মাসেই স্পষ্ট হয়েছে, দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন অনেক কঠিন। এই ছয় মাসে সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ হয়ে দাড়িয়েছে, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ–সব ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও সাম্প্রতিক বাজেটে সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঠামোগত সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
অন্যদিকে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে। নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিরোধী মতের প্রতি অধিক সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে না দেখা। কারণ গণতন্ত্রে বিরোধিতা দুর্বলতা নয়; বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শক্তি। অথচ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রকাশিত হয়েছে, দেশে রাজনৈতিক দলীয় কোন্দল ও নির্বাচনী সহিংসতায় এই ছয়মাসে ৫৬ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে গণ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০৪ জন নারী ও শিশু। নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন ৩৮৪ জন সাংবাদিক। রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খুন–খারাবি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, হামলাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বার্তা প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে। অথচ সরকারের প্রথম ও সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা প্রশ্নমুক্ত রাখা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে– প্রতিষ্ঠানসমূহ সংস্কার। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তি শক্তিশালী হয়েছে, প্রতিষ্ঠান নয়। সরকার পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু প্রশাসনিক সংস্কৃতি প্রায় একই রকম রয়ে গেছে। এমতাবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রশাসন, কার্যকর দুর্নীতি দমন কমিশন এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন স্থানীয় সরকার ছাড়া গণতন্ত্রকে টেকসই করা সম্ভব নয়।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরের শেষ হতেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে তাই বিশেষ করে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার যদি আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন না হয়, তাহলে গণতন্ত্রের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। স্থানীয় সরকারকে প্রকৃত ক্ষমতায়ন না করে শুধু কেন্দ্রীয় সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙিক্ষত রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও জাতীয় নির্বাচনের বাস্তবতা সচেতন নাগরিকদের হতাশ করেছে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের উচ্চপর্যায়ে তাদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতেও নারীর নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। গণতন্ত্র তখনই পরিপূর্ণ হবে, যখন নারী কেবল ভোটার বা প্রতীকী প্রতিনিধি হিসেবে নয়, নীতিনির্ধারক হিসেবেও সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণকে এই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে যে, কোনো সরকারই জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের নির্বাচন আরেকটি বার্তা দিয়েছে, দেশের মানুষ ভোট দিতে চায়, অংশগ্রহণ করতে চায় এবং তাদের ভোটের মূল্য দেখতে চায়।
এখন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি নয় বা প্রশাসনও নয়; সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের সেই নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেনি। বাংলাদেশের মানুষ এবার শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজনীতির ভাষা, আচরণ এবং নৈতিকতার পরিবর্তনও দেখতে চায়। তাই এবার সরকারের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হবে তারা কতগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করল, কতটি সড়ক নির্মাণ করল কিংবা কতটি আইন প্রণয়ন করল–এসব দিয়ে নয়। বরং নির্ধারিত হবে তারা কতটা জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠন পারল, কতটা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারল, কতটা ভয়ের পরিবর্তে আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারল এবং কতটা রাজনৈতিক সহনশীলতার নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারল।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা অনুধাবন করতে পারি এই দেশের জনগণ বিভিন্ন সময়ে শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেনি; তারা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক জীবনের জন্য আন্দোলন করে এসেছে। তাই এটি অমোঘ সত্য যে, জুলাই–পরবর্তী বাংলাদেশের আপামর জনতা কেবল একটি নতুন সরকারই নয়, বরং দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন দেখতে চায়। গণমানুষের সেই কাঙিক্ষত প্রত্যাশা পূরণের গুরুভার এখন সম্পূর্ণরূপে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে ন্যস্ত। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেকোনো পর্যায়ের ন্যূনতম দায়িত্বহীনতা বা উদাসীনতা যেন জনমনে বিন্দুমাত্র অনাস্থা কিংবা ক্ষোভের জন্ম না দেয়–সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ সতর্ক ও দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
লেখক : শিক্ষক ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক











