বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় অনুসন্ধান ও অধিকার আদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। তাঁর কবিতা, সংগীত, কথাসাহিত্য ও মননশীল গদ্য আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি সন্ধিক্ষণে, প্রতিটি সংকট ও সংগ্রামে লড়াকু প্রেরণা জুগিয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের গান থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রতিটি মুহূর্তে নজরুলের বজ্রনিনাদ আমাদের পথ দেখিয়েছে। তাঁর সৃষ্টির মূল সুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন দ্রোহ, শাশ্বত মানবতাবাদ ও সাম্যবাদ কোনো নির্দিষ্ট কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আজ যখন আমরা এই মহান কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিক উদযাপন করছি, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, একবিংশ শতাব্দীর এই জটিল ও আত্মকেন্দ্রিক সমকালে দাঁড়িয়ে নজরুল পাঠের প্রাসঙ্গিকতা ঠিক কতটুকু?
সামান্য গভীরে দৃষ্টিপাত করলেই অনুধাবন করা যায়, কবি তাঁর সমসাময়িক কালে যে সামাজিক অসঙ্গতি, ঔপনিবেশিক শোষণ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, আজ বিশ্বজুড়ে এবং আমাদের প্রাত্যহিক পরিমণ্ডলে সেই ব্যাধিগুলো আরও সূক্ষ্ম, প্রাতিষ্ঠানিক ও সুদূরপ্রসারী রূপ পরিগ্রহ করেছে। ফলে সমকালীন প্রেক্ষাপটে নজরুলকে নতুন করে পড়া, তাঁর সাহিত্যকে পুনঃমূল্যায়ন করা এবং তাঁর আদর্শকে আত্মস্থ করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি, বরং তা আগের চেয়ে বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
নজরুল মূলত সাম্যের কবি, মানুষের কবি। তাঁর সামগ্রিক সৃষ্টির এক সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে ব্রাত্য ও শ্রমজীবী মানুষের জয়গান। জাত–পাত, ধর্ম–বর্ণের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে তিনি মানুষকে স্থান দিয়েছেন সবার ওপরে। আজকের আধুনিক বিশ্বে যখন তীব্র পরমত–অসহিষ্ণুতা, জাতিগত দাঙ্গা, বর্ণবাদ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, তখন নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতার সেই ধ্রুববাণী ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ এক পরম সত্যের মতো আমাদের বিবেককে তাড়িত করে। সমকালের এই আত্মিক সংকটে ধর্মীয় সমপ্রীতি ও অসামপ্রদায়িক চেতনা বিনির্মাণে নজরুলের গদ্য ও পদ্যের চেয়ে শক্তিশালী কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হতে পারে না। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে উন্মোচন করেছিলেন কীভাবে ধর্মকে পুঁজি করে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল সাধারণ মানুষকে শোষণ করে। তাঁর সেই প্রগতিশীল ও তীক্ষ্ণ সচেতনতা আজ আমাদের সমাজকে ধর্মান্ধতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্য ভীষণভাবে জরুরি।
সাধারণত নজরুলকে কেবলই দ্রোহের কবি হিসেবে একরৈখিকভাবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, কিন্তু তাঁর কথাসাহিত্য ও গদ্যের গভীরতা তৎকালীন সমাজকে চেনার এবং বর্তমান সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করার এক অনন্য দলিলভাষ্য। নজরুলের উপন্যাসত্রয়ী ‘বাঁধন–হারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং ‘কুহেলিকা’ তৎকালীন বাঙালি সমাজের নিখুঁত বাস্তব চিত্র, মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং উত্তাল রাজনৈতিক আন্দোলনের এক প্রামাণ্য চালচিত্র। বিশেষ করে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে তিনি যেভাবে অবহেলিত মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং তাদের মনোজাগতিক পরিবর্তনের রেখাচিত্র এঁকেছেন, তা আজকের পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার সাথে হুবহু মিলে যায়। বর্তমান কর্পোরেট যুগেও যখন আমরা দেখি একদিকে অকল্পনীয় সম্পদের পাহাড় জমছে, আর অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তখন নজরুলের গদ্য আমাদের সুপ্ত চেতনাকে নাড়া দেয়। তাঁর উপন্যাসগুলো কেবল নিছক বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়, বরং তা সমাজকে আমূল বদলে দেওয়ার এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইশতেহার।
সমকালের আরেকটি বড় সংকট হলো বাক–স্বাধীনতা এবং মুক্তচিন্তার প্রকাশপথ সংকুচিত হওয়া। নজরুল তাঁর সমসাময়িক সময়ে ব্রিটিশ রাজের তীব্র নিপীড়ন, কারাদণ্ড ও বাজিয়াপ্তির মুখে দাঁড়িয়েও ‘ধূমকেতু’ বা ‘লাঙল’ পত্রিকার মাধ্যমে যে আপসহীন সাংবাদিকতা ও গদ্য রচনা করেছিলেন, তা আজীবন মুক্তবুদ্ধি চর্চার এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’তে কবি যেভাবে শাসকের অন্যায় আদালতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরম সত্যের জয়গান গেয়েছেন, তা আজ যেকোনো নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অবিনাশী প্রেরণা। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যখন সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়ে এক ধরনের অবক্ষয়, হতাশা কিংবা যান্ত্রিক উদাসীনতায় ভোগে, তখন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ বা ‘সর্বহারা’র মতো সৃষ্টিগুলো তাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখায়। তিনি তরুণদের এই দীক্ষা দিয়েছেন যে, অন্যায়ের সামনে কাপুরুষের মতো মাথা নত না করে কীভাবে নিজের ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়।
নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতার (জেন্ডার ইকুইটি) প্রশ্নেও সমকালে নজরুলের পাঠ অপরিহার্য। আজ যখন আমরা আধুনিক পরিভাষায় নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক আলোচনা করি, নজরুল তার বহু আগেই অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও জোরালো ভাষায় উচ্চারণ করেছিলেন যে, এই পৃথিবীর যা কিছু মহান ও কল্যাণকর সৃষ্টি, তার অর্ধেক করেছে নারী আর অর্ধেক নর। তিনি নারীর অবমাননাকে পুরুষের নিজেরই নৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য করেছেন। তাঁর ‘নারী’ কবিতা কিংবা বিভিন্ন গল্প–উপন্যাসে নারী চরিত্রের যে স্বাধিকারপ্রমত্ত ও তেজস্বী রূপ আমরা দেখি, তা বর্তমান যুগের জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, বৈষম্য ও কুসংস্কার দূরীকরণে এক অনন্য দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করতে পারে।
তাছাড়া, নজরুল আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক মহান সমন্বয়ক। তিনি একদিকে যেমন সুফি ভাবধারা, ইসলামি গজল ও হামদ–নাত লিখে মুসলিম মানসকে সুপ্ত অবস্থা থেকে জাগিয়েছেন, অন্যদিকে সমান্তরালভাবেই রচনা করেছেন কালজয়ী শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও রাগপ্রধান গান। এই যে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও সমন্বয়বাদী চেতনা, এটিই বাঙালির মূল শক্তি। আজকের মেরুকৃত সমকালে যেখানে সংস্কৃতিকে রাজনীতিকরণ করে মানুষকে পরস্পরের থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলে, সেখানে নজরুল পাঠ আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন ধারাকে এক সুতোয় বেঁধে একটি অখণ্ড মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হয়।
নজরুলের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করতে হবে, নজরুল কেবল পাঠ্যপুস্তকের জড় পাতা কিংবা উৎসবের আনুষ্ঠানিক মঞ্চে স্মরণ করার মতো কোনো অতীত ইতিহাস নন। তিনি অত্যন্ত জীবন্ত, গতিশীল, প্রগতিশীল এবং চির–সমকালীন। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে শ্রেণিভিন্নতা ও বৈষম্য থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের পরিচয়ের চেয়ে তার ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয় বড় করে দেখে নিপীড়ন চালানো হবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত শোষকের দণ্ড শোষিতের ওপর আবর্তিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা ম্লান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সমকালের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন, প্রতিটি অন্যায় প্রতিরোধ এবং একটি সুস্থ, অসামপ্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গঠনের লড়াইয়ে কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের চিরকালের পাথেয় আমাদের যৌথ চেতনার এক অনিভেদ্য বাতিঘর।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক। সদস্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম অনুবাদ ও রিভিউ কমিটি।












