দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা আগামী বছরের ৭ জানুয়ারি এবং এইচএসসি পরীক্ষা ৬ জুন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে করোনা মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রশাসনিক নানা জটিলতায় শিক্ষাবর্ষ ও পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষাবর্ষকে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে অপর্যাপ্ত শ্রেণি কার্যক্রম ও বিশাল শিখন ঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা কীভাবে জীবনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেবে?
বাংলাদেশের শিক্ষা বাস্তবতায় শ্রেণিকক্ষই শিক্ষার প্রধান ভিত্তি। এখনও দেশের বড় অংশের শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষক ব্যাখ্যা ও সরাসরি অনুশীলনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, পুরো শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত ক্লাস করার সুযোগই পাচ্ছে না। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা এখনও চলমান। দেশের অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় গত ১৮ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। এই দীর্ঘ বিরতি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠাভ্যাসে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
২১ মে থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেও পরদিন থেকেই সাপ্তাহিক ছুটি। এরপর ২৪ মে থেকে শুরু হচ্ছে ঈদুল আজহার ছুটি, যা চলবে ৭ জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ মে ও জুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাস্তবে ক্লাস চলার সুযোগ খুবই সীমিত। এর কিছুদিন পরই শুরু হবে প্রাক–নির্বাচনী পরীক্ষা। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার পর্যাপ্ত সময়ই পাচ্ছে না।
বছরের শুরু থেকেই পরিস্থিতি ছিল একই রকম। সরকার জানুয়ারিতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের যে উদ্যোগ নেয়, তা গত কয়েক বছর ধরে সময়মতো সম্পন্ন হচ্ছে না। এবারও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বই পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। ফলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। এর পাশাপাশি সরকার নির্দেশনা দিয়েছিল জানুয়ারির মধ্যেই বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবতা হলো এগুলোতে মাসের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়েছে। জানুয়ারিতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম খুব সীমিত ছিল।
ফেব্রুুয়ারি ও মার্চ মাসেও শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল না। নির্বাচন, রোজা, ঈদ, স্বাধীনতা দিবস ও বিভিন্ন ধর্মীয় দিবস উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির কারণে মার্চের শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা খুব অল্প সময় ক্লাস করার সুযোগ পেয়েছে। তিন মাসে মোট কার্যকর শ্রেণি কার্যক্রম হয়েছে আনুমানিক ১৫ দিনের মতো। এরপর জুন মাসেও যদি ১৫ দিনের মতো ক্লাস হয়, তাহলেও পুরো শিক্ষাবর্ষে ক্লাসের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
প্রাক–নির্বাচনী পরীক্ষার পর অক্টোবর পর্যন্ত কিছু শ্রেণি কার্যক্রম চললেও সেটি আবার বর্ষা মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে বর্ষাকালে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, বন্যা, পাহাড় ধস কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার নজির নতুন নয়। ফলে পরিকল্পিত শ্রেণি কার্যক্রমও প্রায়ই ব্যাহত হয়। অন্যদিকে নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনী পরীক্ষার পর আর পূর্ণাঙ্গ ক্লাস পরিচালনার সুযোগ থাকে না। সব মিলিয়ে একটি পূর্ণ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা হয়তো ৮০ থেকে ৮৫ দিনের বেশি ক্লাস করতে পারবে না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি শিক্ষাবর্ষে কমপক্ষে ১৮০ থেকে ২০০ কার্যদিবস থাকা প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলোতে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অর্ধেকেরও কম সময় শ্রেণিকক্ষে থেকে কীভাবে একই মানের শিক্ষা অর্জন করবে তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। শহরের কিছু শিক্ষার্থী কোচিং, ব্যক্তিগত শিক্ষক কিংবা অনলাইন শিক্ষার সুযোগ পেলেও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী এখনও বিদ্যালয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ক্লাস না হলে তাদের পড়াশোনাও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য আরও বাড়ছে। একদিকে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা বিকল্প ব্যবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এ অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপেও ভুগছে। সিলেবাস শেষ না হওয়া, পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসা এবং প্রস্তুতির ঘাটতি তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। অভিভাবকরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কারণ সস্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। শিক্ষা যদি আত্মবিশ্বাস ও জ্ঞান অর্জনের জায়গা হয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি অনেকাংশে ভয় ও চাপের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।
সরকারের উদ্দেশ্য যে ইতিবাচক, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। শিক্ষাবর্ষকে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। কিন্তু যেকোনো নীতিগত পরিবর্তনের আগে বাস্তবতা মূল্যায়ন জরুরি। কেবল পরীক্ষার সময়সূচি এগিয়ে আনলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না। বরং পর্যাপ্ত শ্রেণি কার্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, সময়মতো পাঠ্যবই, কার্যকর পাঠদান ও মানসম্মত মূল্যায়ন এসবের সমন্বয়েই গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত হয়। তাই এ পরিস্থিতিতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষা কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রক্রিয়া। তাই শিক্ষার্থীদের বাস্তব সক্ষমতা ও শিখন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে এনে হয়তো শিক্ষাবর্ষকে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা সম্ভব হবে, কিন্তু যদি শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা ও শিখন ফল অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সেই সাফল্য হবে কেবল কাগুজে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপ্রন্তুত অবস্থায় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেটি হতে হবে পরিকল্পিত, ধীরস্থির ও গঠনমূলক।
লেখক: কলেজ শিক্ষক, কলামিস্ট।












