আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের দক্ষ করে তুলতে পদক্ষেপ নিন

| শনিবার , ১৬ মে, ২০২৬ at ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চলতি মাসে প্রকাশিত ‘লাইফলং লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে দেশের আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশই গত তিন বছরে একদিনের জন্যও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। যদিও এর ৫০ শতাংশ কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ও চাহিদা উপলব্ধি করেছেন। অর্থাৎ কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবেও কর্মসংস্থানে নিয়োজনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকসব ধরনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই এ সমস্যা প্রকট। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। বিগত এক দশকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াস থাকলেও তা এগিয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৯২ শতাংশের ওপর। অর্থাৎ মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে না ওঠার একটি প্রধানতম কারণ। এ সংকট আরো ঘনীভূত হয় যখন স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নানা প্রেক্ষাপটে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। যে কারণে যোগ্যতা থাকলেও ভালো চাকরির বাজার তৈরি হচ্ছে না, আর মানুষ বাধ্য হয়ে যেকোনো কাজ বেছে নিচ্ছেন। এতে ছদ্ম বেকারত্বের হারও বাড়ছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের প্রয়োজনমাফিক দক্ষ করে তুলতে হলে সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে সরকারের উদ্যোগ কেবল এ খাত ঘিরে হলে চলবে না। অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমশক্তি পুরো দেশের বিভিন্ন শ্রম খাতের বাস্তবতা। তাই সরকারকে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে, যা দেশের শ্রমবাজারের বিদ্যমান চিত্রে আমূল পরিবর্তন আনবে এবং সে পরিকল্পনা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই। এ পরিকল্পনা গ্রহণের অংশ হিসেবে সবার আগে সরকারকে পুরো শ্রমশক্তির সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন খাতে কতজন নিয়োজিত রয়েছেন, সেখানে কতজন দক্ষ আর কতজন অদক্ষ, নিকট ভবিষ্যতে কোন খাতে কত জনবলের চাহিদা তৈরি হবে সেগুলোর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ মূল্যায়নের ফলাফলকে অগ্রাধিকারে রেখে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে সেটি ক্রমপরিবর্তনশীল স্থানীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এতে স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানিতে এগিয়ে থাকা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে শিক্ষিতের হার শতকরা ৭০ শতাংশের মতো হলেও মোট জনশক্তির প্রায় একতৃতীয়াংশই বেকার। যাদের অধিকাংশই শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত, কিংবা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে লক্ষাধিক, যাদের বেশিরভাগের কর্মসংস্থান হয় না। ফলে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও। পরিসংখ্যান মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। এমনিতেই বিশ্ব মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বেই কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। দেশে কর্মসংস্থান যে হারে বাড়ছিল, তা হ্রাস পেয়েছে নানা কারণে। তাই অনেকে শ্রম বেচতে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা অস্থিরতার কুফল যেসব দেশ ভোগ করছে বাংলাদেশ তার অন্যতম। সারা বিশ্বে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি নাগরিক কর্মসংস্থানের কারণে বসবাস করছে। সার্বিক পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ তা সহজেই অনুমেয়। পরিস্থিতির অবনতি রোধে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ কোনোটাই মূলত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে বৃহৎ এ জনগোষ্ঠী সম্পদ নয়, রাষ্ট্রের বোঝা হিসেবেই ভাবা হচ্ছে। তাঁদের মতে, দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন কর্মপরিবেশের উপযোগী শ্রমশক্তি তৈরিও জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার মানের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। যে শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দিচ্ছে, তা কর্মবাজারের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়েও এমন দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না, যা দিয়ে তাঁরা চাকরি পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের দিক থেকে অঞ্চলভেদে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। তাঁরা বলেন, আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর এ জন্য প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ। বিনিয়োগের মাধ্যমে যেমন ব্যবসা ও শিল্প গড়ে ওঠে, তেমনি কাজের সুযোগও তৈরি হয়। তাতে মানুষের ভোগ বাড়ে, গতি আসে অর্থনীতিতে। তাই আগামীতে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে