গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

| সোমবার , ১১ মে, ২০২৬ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বেনবেইজ) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৯৪ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫৩টি রয়েছে গ্রামাঞ্চলে (৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ)। এদিকে মাধ্যমিক স্তরের ৬৮ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। উচ্চ ব্যয় ও গ্রামীণ সুযোগসুবিধার অভাব থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ স্তর থেকে ঝরে পড়ে। ফলে মাধ্যমিক স্তরকে ঘিরে কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার সংকট বাড়ছেই। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে দেশের সব প্রান্তে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টিকে জোর দিতে হবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মাধ্যমিক শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এ স্তরেই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ বা শ্রমবাজারে প্রবেশের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার পরিমাপ উদ্যোগের (এইচআরএমআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার আয়স্তর অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষায় যতটা অর্জন করার কথা তার মাত্র ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি এবং শহরকেন্দ্রিক। দেশে ১৬ হাজারেরও বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশই বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্র মূলত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকদের আংশিক বেতন দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অভিভাবকদের বহন করতে হয় শিক্ষার সিংহভাগ ব্যয়। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিবারগুলো মোট শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশ নিজেরাই বহন করে। ফলে আর্থিকভাবে সক্ষম নয় এমন পরিবারগুলো অনেক সময় সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারে না। বিশেষত দুর্বল গ্রামীণ অর্থ ব্যবস্থায় শিক্ষা ব্যয় বহন অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্যই শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ ও সুযোগসুবিধা প্রসারের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পনা নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষা অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রান্তিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে মনোযোগ দেয়া যায়নি। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোর ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক সমতা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষায় আর্থিক বৈষম্য সবচেয়ে প্রকটভাবে দেখা যায় মাধ্যমিক স্তরে। কারণ এই স্তরের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি। বিশেষ করে গ্রাম, চর ও হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এ ক্ষেত্রে বেশি অবহেলিত। সরকার এমপিওভুক্তির মাধ্যমে কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমপিওভুক্তি সব সমস্যার সমাধান নয়। একটি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষকদের বেতনভাতার একটি অংশ সরকারি সহায়তায় আসে, কিন্তু শিক্ষার্থীর পরিবারের ওপর থাকা অন্যান্য ব্যয় পুরোপুরি কমে না। একই সঙ্গে অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, মানসম্মত পাঠদান, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, নিরাপদ যাতায়াত এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীর সহায়তাএসব ক্ষেত্রেও ঘাটতি থেকে যায়। ফলে শুধু এমপিওভুক্তি দিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার বৈষম্য দূর করা কঠিন।

মাধ্যমিক শিক্ষায় বৈষম্য কমাতে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন বলে তাঁরা মনে করেন। প্রথমত, গ্রামাঞ্চলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, চর, হাওর, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা নিতে হবে। তৃতীয়ত, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য ফি মওকুফ, শিক্ষা উপকরণ সহায়তা ও যাতায়াত সহায়তা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা চালুর বিষয়টি নতুনভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। পঞ্চমত, এমপিওভুক্তির পাশাপাশি শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁরা বলেন, গ্রামীণ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা উন্নত মানের শিক্ষা দিতে পারে। গ্রামীণ এলাকায় কম্পিউটার ল্যাব এবং ইন্টারনেট সুবিধা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের ভোগান্তি কমিয়ে আনতে হবে। গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে দেশবিদেশের বড় সংস্থাগুলোর সাহায্য নিতে হবে। গ্রামীণ শিক্ষার এই সমস্যাগুলো দূর করা শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। যখন শহুরে ও গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে তখনই সবার জন্য সমতাভিত্তিক শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধবসন্ত কুমার বিশ্বাস : অগ্নিযুগের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ বিপ্লবী