অতি ভারি বৃষ্টিতে নগরীর প্রবর্তক মোড় ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকার হিজরা খাল সংলগ্ন দোকানের নানা পণ্য পানিতে ভাসে। গতকাল সকালে পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর দোকানের মালিক–কর্মচারীদের দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিসপত্র সরিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে দেখা যায়। দোকানে প্রবেশ করা নালার কর্দমাক্ত ময়লা পানি বালতিতে করে বাইরে ফেলছেন তারা। কয়েকজনে পানির মধ্য থেকে কুড়িয়ে নিয়ে মাস্ক ও বিভিন্ন সার্জিক্যাল চিকিৎসা সামগ্রী রোদে শুকাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, জীবনে এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। পর পর দুইদিন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে আমাদের দোকান কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। ওষুধ ও সার্জিক্যাল দোকানের পণ্যগুলোতে পানির স্পর্শ লাগলেই সমস্যা। সেখানে এসব পণ্য পানিতে ভেসেছে। আমাদের চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। প্রবর্তক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল এলাকার হিজরা খাল সংলগ্ন ল্যাব– ডেন্টাল চেম্বারসহ অন্তত ২০–৩০টি দোকান আছে। এরমধ্যে কয়েকটি আবার হিজরা খাল ঘেঁষা। খালে বাঁধ থাকার কারণে দোকানের মধ্য দিয়ে স্রোত গেছে রীতিমতো। সব মিলিয়ে এই এলাকার ব্যবসায়ীদের অন্তত ৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল এলাকার কে কোবরা নামের সার্জিক্যাল দোকানে গিয়ে দেখা গেছে, দোকানের কর্মচারী ঝাঁড়ু দিয়ে খালের কাঁদা মাটি পরিষ্কার করছেন। শাহজাহান নামের সেই কর্মচারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমাদের দোকানে ডায়াবেটিস মেশিন, মেশিনের স্ট্রিপ, প্রেসার মেশিন, নেবুলাইজার মেশিন ও বিভিন্ন সার্জিক্যাল পণ্য রয়েছে। পানিতে আমাদের অন্তত ৩ লাখ টাকার পণ্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
অন্যদিকে বোয়ালখালীর বাসিন্দা রুবেল চৌধুরী জানান, গত বছর দশেক আগে ঋণ নিয়ে ছোট একটি ওষুধ ও সার্জিক্যাল পণ্যের দোকান খুলেন। ব্যবসার উন্নতিও হচ্ছে ভালোভাবে। কিন্তু আচমকা খালের পানির বেপরোয়া স্রোত তার এত বছরের সব সাধনা যেন এলেমেলো করে দিয়েছে। গতকাল সকালে তিনি পানি থেকে কুড়িয়ে নিয়ে মাস্ক ও বিভিন্ন সার্জিক্যাল আইটেম রোদে শুকান। এ সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, এত বছরের ব্যবসা দোকানে এভাবে পানি ঢুকবে স্বপ্নেও ভাবিনি। জলাবদ্ধতা দূরকরণ প্রকল্প আমাদের জলে ভাসিয়ে দিলো। পানিতে ফ্রিজ, ইনসুলিন ও বিভিন্ন ওষুধ নষ্ট হয়েছে বলে জানান তিনি।
তার পাশের দোকানটি আয়াত সার্জিক্যাল। তাদের ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি। পানিতে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত কোটি টাকার বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। ইলেকট্রিক হুইলচেয়ার, ইলেকট্রিক বেড, নেবুলাইজার, অঙিজেন কনসেন্ট্রেটর, ব্লাড প্রেসার মেশিন, অঙিমিটার, সার্জিক্যাল বেল্ট, কম্পিউটার, মনিটর, সিসিটিভি ক্যামেরা, আইপিএস সবই পানির নিচে ডুবে যায়। আয়াত সার্জিক্যালের তানভির বলেন, এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা কঠিন।
আয়াত সার্জিক্যালের পাশের আরিফ মেডিকো। দোকানের স্বত্বাধিকারী তৌহিদুল ইসলাম দোকানের পানিতে দাঁড়িয়ে ওষুধের বঙ থরে থরে সাজাচ্ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার কিছু বলার নাই। কাকে দোষ দিব? নিজের ভাগ্যকে ছাড়া আর কাউকে দোষ দেয়ার নাই। ব্যবসাতে এমনিতে আমরা সরকারের কোনো ধরণের সুযোগ সুবিধা পাই না। তার ওপর সরকারের লোকদের খামখেয়ালির কারণে আমাদের ডুবতে হয়েছে। ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস তো আবহাওয়া অফিস থেকে জানা যায়। তাহলে খালের বাঁধগুলো কেন খুললো না? এখন খুলে কি হবে। আমাদের যা ক্ষতি হওয়ার তো হয়ে গেছে।
অন্যদিকে প্রবর্তক এলাকার একটি ভবনের নিচতলায় দন্তচিকিৎসক উম্মে রিফাত হাসনাত নাবিলার ছোট্ট চেম্বারটি এখন অচল। কিছুদিন আগেই নিজস্ব চেম্বার শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু এক বিকেলের পানিতে তার প্রায় সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। চেম্বারে ঢুকে দেখা যায়, রোগী বসার চেয়ার, টেবিল, ফাইলপত্র, দেয়ালের সকেট– সবকিছু ভেজা। পানির নিচে ডুবে গেছে ডেন্টাল চেয়ার ইউনিট, স্কেলার মেশিন, মাইক্রোমোটর, এয়ার কমেপ্রসার, অটোক্লেভসহ প্রায় সব সরঞ্জাম। নাবিলা বলেন, অনেক স্বপ্ন নিয়ে চেম্বারটা সাজিয়েছিলাম। নতুনভাবে পেশাজীবন শুরু করেছি। কিন্তু একদিনের পানিতে সবকিছু থেমে গেলো। এখন নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু সেই সামর্থ্য নাই। কিন্তু চলার জন্য হলেও ধারকর্জ করে শুরু করতে হবে।














