রোমাঞ্চকর জয়, সিরিজ বাংলাদেশের

তৃতীয় ম্যাচে পাকিস্তানের ১১ রানে হার

ক্রীড়া প্রতিবেদক | সোমবার , ১৬ মার্চ, ২০২৬ at ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ

সিরিজ নির্ধারণী শেষ ওয়ানডেতে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে পাকিস্তানকে ১১ রানে হারাল বাংলাদেশ। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ জিতে সিরিজও জিতে নিল বাংলাদেশ। আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ের ৪ নম্বরে থাকা দলকে ২১ ব্যবধানে হারিয়ে এক ধাপ এগিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ের ৯ নম্বরে ওঠা নিশ্চিত করেছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। মিরপুরে গতকাল রোববার তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরিতে ৫০ ওভারে বাংলাদেশ তোলে ২৯০ রান। জবাবে পাকিস্তান ৫০ ওভারে থামে ২৭৯ রানে। রান তাড়ায় শুরুতে বিপর্যয়ে পড়া পাকিস্তানের ত্রাতা হয়ে ওঠেন সালমান আলি আগা। এই ম্যাচ তিনি জমিয়ে তোলেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে। শেষ দিকে দারুণ ইনিংস উপহার দেন আফ্রিদিও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্নায়ুর চাপকে হারিয়ে ম্যাচ জিতে নেয় বাংলাদেশ। শেষ ওভারে রিশাদ চমৎকার বোলিং করলেও বাংলাদেশের বোলিং নায়ক তাসকিন আহমেদ। নতুন বলে আগুনে স্পেলের পর মাঝে ও শেষেও দারুণ গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন তিনি। সেঞ্চুরিয়ান সালমান যখন বাংলাদেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন, তখন দারুণ স্লোয়ারে তাকে ফিরিয়ে দলকে ম্যাচে ফেরান অভিজ্ঞ এই পেসার। বাংলাদেশ এ দিন ব্যাটিংয়ে নামে টস হেরে। আগের ম্যাচে ১১৪ রানে গুটিয়ে যাওয়া দল এবার উদ্বোধনী জুটিতেই ১০৫ রান তুলে ফেলে ১৮ ওভারে। জুটিতে দুই ওপেনারের ব্যাটিং ছিল অবশ্য বিপরীতমুখি। তানজিদের ব্যাট শুরু থেকেই ছিল উত্তাল। সাইফের উপস্থিতি ছিল অস্বস্তিতে ভরা, এগিয়েছেন ধুঁকতে ধুঁকতে। ম্যাচের দ্বিতীয় ওভারেই হারিস রউফকে চার ও ছক্কা মারেন তানজিদ, একটু পরে রউফকেই ছক্কায় উড়িয়ে দেন দুর্দান্ত আপার কাট শটে। স্পিন আক্রমণে এনেও থামানো যায়নি তার ব্যাটের গতি। ৪৭ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন তানজিদ। ৪৫ বল খেলে সাইফের রান তখন ৩০। একটু পরই ভাঙে এই জুটি। নতুন স্পেলে ফেরা শাহিন শাহ আফ্রিদির প্রথম বলেই এলোমেলো শটে বোল্ড হন সাইফ ৫৫ বলে ৩৬ রান করে। দ্বিতীয় উইকেটে নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে তানজিদ যোগ করেন ৬৭ বলে ৫৩ রান। রউফের স্কিড করা ডেলিভারিতে শান্ত এলবিডব্লিউ হন ৩৪ বলে ২৭ রান করে। তানজিদ নিজের মতো খেলেই এগিয়ে যান শতরানের দিকে। ৯৪ রান থেকে সালমান আলি আগার বলে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে লং অফ দিয়ে ছক্কায় তিনি পৌঁছে যান কাঙ্খিত ঠিকানায়।

একটু পরই থামে তার এই পথচলা। আবরারের টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়া বেশ বাইরের বলে আলগা শটে ক্যাচ দেন তিনি শর্ট কাভারে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম শতরানে ১০৭ বলে ১০৭ রান করেন তানজিদ। বাংলাদেশ তখন তিনশ ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা জাগিয়েছে ভালোভাবেই। পরের জুটিতে ৬১ বলে ৬৮ রান করেন লিটন কুমার দাস ও তাওহিদ হৃদয়। ৫১ বল খেলে লিটন করতে পারেন ৪১ রান। রিশাদ হোসেন বোল্ড হয়ে যান প্রথম বলেই। হৃদয় শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেও সেভাবে ঝড় তুলতে পারেননি। অপরাজিত থাকেন তিনি ৪৪ বলে ৪৮ রান করে। আফিফ হোসেন শেষ দিকে ৮ বলে করেন ৫ রান।

রান তাড়ায় পাকিস্তানকে শুরুতেই নাড়িয়ে দেন তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানা। প্রথম ৩ ওভারে ৩ উইকেট হারায় তারা। প্রথম ওভারে তাসকিনের বাড়তি লাফানো দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বিদায় নেন সাহিবজাদা ফারহান। দ্বিতীয় ওভারে নাহিদ রানার বলে নান্দনিক এক শটে ছক্কা মারেন মাজ সাদাকাত। দুই বল পরই বাউন্সারে তাকে ফিরিয়ে প্রতিশোধের হুঙ্কার ছোড়েন নাহিদ। পরের ওভারে তাসকিনের আরেকটি দারুণ ডেলিভারি এলোমেলো করে দেয় মোহাম্মাদ রিজওয়ানের স্টাম্পস। সেই ধাক্কা সামলে কিছুটা লড়াই করেন অভিষিক্ত মুহাম্মাদ গাজি ঘোরি ও তৃতীয় ম্যাচ খেলতে নামা আব্দুল সামাদ। চতুর্থ উইকেটে অর্ধশত রানের জুটি গড়েন দুই নবীন। জুটি ভাঙতে নাহিদকে ফেরানো হয় আক্রমণে। নতুন স্পেলের প্রথম ওভারেই ১৪৫.৭ কিলোমিটার গতির বল সামলাতে না পেরে বোল্ড হয়ে যান ঘোরি ৩৯ বলে ২৯ রান করে। একটু পরে মোস্তাফিজুর রহমান নতুন স্পেলে ফিরে বিদায় করেন সামাদকে। তিনি ৪৫ বলে ৩৪ রান করেন। ৮২ রানে ৫ উইকেট হারানো দল লড়াইয়ে ফেরে পরের জুটিতে। সাবধানী শুরুর পর ক্রমে রানের গতিতে দম দেন সালমান। রিশাদ হোসেনের বাজে বোলিং কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান বাড়ান তিনি। অভিষেকে সম্ভাবনার ঝলক দেখান সাদ মাসুদ। জুটি জমে ওঠে দারুণ। এই জুটি ৭৯ রানে থামে মাসুদের অনভিজ্ঞতায়। মোস্তাফিজকে ক্রিজে ছেড়ে বেরিয়ে খেলতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যান ২১ বছর বয়সী লেগ স্পিনিং অলরাউন্ডার। ৪৪ বলে ৩৮ রান করেন তিনি।

সালমান এরপর আরেকটি কার্যকর জুটি গড়েন ফাহিম আশরাফের সঙ্গে। এই জুটি পুরোপুরিই ছিল সালমানময়। নিজের সহজাত ব্যাটিং দমিয়ে রেখে স্রেফ উইকেট আঁকড়ে রাখেন ফাহিম। ফাহিম টিকে থাকলে শেষ দিকে বিপজ্জনক হতে পারতেন। তাকে বোল্ড করে দেন তাসকিন। ২০ বলে ৯ রান করেছিলেন তিনি। এবার সালমান সঙ্গী পান আফ্রিদিকে। আরেকটি জুটি জাগিয়ে তোলে পাকিস্তানের আশা। দুজনের দারুণ ব্যাটিংয়ে জুটির ফিফটি আসে ৪৬ বলে। নাহিদ রানার বলে দারুণ শটে ছক্কায় সালমান শতরানে পৌঁছে যান ৮৯ বলেই। ওয়ানডেতে তার তৃতীয় শতরান এটি। বাংলাদেশ তখন প্রবল শঙ্কায়। স্পিনের একটি ওভার তখনও বাকি। তবে সালমানকে আউট করার আশায় পেসারদের দিয়েই চালিয়ে নিতে থাকেন অধিনায়ক মিরাজ। তাতে কাজ হয়। তাসকিনের শেষ ওভারে স্লোয়ার বলে ছক্কার চেষ্টায় মিড উইকেটে ধরা পড়েন সালমান। তবে ৪৯তম ওভারে মোস্তাফিজকে দুটি ছক্কা মেরে দেন আফ্রিদি। ম্যাচ জমে ওঠে আবার। ওভারের পঞ্চম বলে আফ্রিদির শট গিয়ে লাগে মোস্তাফিজের হাঁটুতে। ব্যথায় পিচে পড়ে যান তিনি। লম্বা সময় ধরে মাঠেই চিকিৎসা চলে তার। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে শেষ বলটি করতে ছোটেন তিনি। ওই ডেলিভারিতেই ছক্কার চেষ্টায় বিদায় নেন হারিস রউফ। শেষ ওভারে প্রয়োজন পড়ে ১৪ রানের। রিশাদ হোসেন আর সাইফ হাসানের একজনকে বেছে নিতে হতো। আগের ৬ ওভারে ৫৪ রান দিলেও বিশেষজ্ঞ বোলার রিশাদকেই বেছে নেন অধিনায়ক। হতাশ করেননি এই লেগ স্পিনার। প্রথম বলটি করেন তিনি গুগলি। ডিফেন্স করেন আফ্রিদি। পরের বলে হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ দেন তিনি, যা নিতে পারেননি রিশাদ। তৃতীয় বলে দুটি রান নিতে পারেন আফ্রিদি। চতুর্থ বলে আরেকটি গুগলিতে ব্যাটেবলেই করতে পারেননি ব্যাটার। ২ বলে যখন প্রয়োজন ১২ রান, তখন আরেকটু নাটকীয়তা। রিশাদের লেগ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে ওয়াইডের সঙ্কেত দেন আম্পায়ার। বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা করে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তে এলবিডব্লিউয়ের রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। রিপ্লেতে দেখা যায়, আফ্রিদির ব্যাটের একদম মাথায় হালকা ছুঁয়ে যায় বল। যেটির মানে, বৈধ ডেলিভারি এবং রান নেই। নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়। শেষ বলেও ব্যাটে ছোঁয়াতে পারেননি আফ্রিদি, স্টাম্পিং করেন লিটন। উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ দল। ম্যান অব দা ম্যাচ হন তানজিদ হাসান। ম্যান অব দা সিরিজ তানজিদ হাসান ও নাহিদ রানা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলাইলাতুল কদর : আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের বড় সুযোগ
পরবর্তী নিবন্ধসাগরিকায় কারখানা শ্রমিক আকাশ দাশ হত্যা মামলার পলাতক আসামি গ্রেপ্তার