শেষ হলো এবছরের নোবেল বিজয়ীদের নাম প্রকাশের পালা। প্রতিবছর আমরা প্রতীক্ষায় থাকি কে কোন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন এবং কোন দেশ হতে। এর মাধ্যমে গবেষণায় কোন দেশ নেতৃত্ব দিচ্ছে তা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠে। এবার ৩ অক্টোবর চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীর নাম দিয়ে শুরু হয়ে ১০ অক্টোবর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সকল জল্পনা কল্পনার। আমি এবার পদার্থবিদ্যায় যে তিনজন যৌথভাবে নোবেল পেলেন তাদের সম্পর্কে এবং তারা যে বিষয়ে গবেষণায় নোবেল পেলেন তা সম্পর্কে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।
পদার্থবিজ্ঞানের এবারের নোবেল বিজয় মূলত কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং কোয়ান্টামে পাথফাইন্ডিংয়ে সাফল্যের জন্য। যৌথভাবে এ কাজের জন্য এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফ্রান্সের প্যারিস-স্যাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালাইন অ্যাসপেক্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার জেএফ ক্লজার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের জন এফ ক্লজার এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টন জেইলিঙ্গার। নোবেল পুরস্কারের অর্থ এই তিনজন বিজয়ীর মাঝে সমান অংশে ভাগ দেওয়া হয়েছে। উনারা মূলত তিনজন তিন জায়গায় স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন। তিনজন গবেষকের প্রত্যেকেই কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট নিয়ে কাজ করেন। তারা সফলতার সাথে যে পরীক্ষাটি চালিয়েছেন সেটি হলো, দুটি কণা আলাদা হয়ে গেলেও একটি একক কণার মত আচরণ করে। তাদের তিনজনের এই ফলাফল কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে নতুন প্রযুক্তির পথ আবিষ্কার করেছে। আসুন আমরা জানার চেষ্টা করি এই নতুন প্রযুক্তির পথটি কী?
আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে এনট্যাঙ্গল শব্দটার অর্থ কী? এটি এমন একটি অবস্থাকে নির্দেশ করে, দুটি সিস্টেম এত দৃঢ়ভাবে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত যে- একটি সিস্টেম সম্পর্কে তথ্য লাভ করলে, অন্যটি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যাবে, সিস্টেমগুলো যত দূরে থাকুক না কেন। মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনাটি আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছিল এবং এটিকে দূরবর্তী সময়ে একটি ভূতুড়ে কাজ বলে অভিহিত করেছিলেন। আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন, যেকোনো তথ্য আলোর গতির চেয়ে দ্রুত প্রেরণ করা যায় না। এই এনট্যাঙ্গল ধারণাটি আইনস্টাইনের ওই বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। গবেষণা মতে, গতানুগতিক যে হিসাব নিকাশ করা হয় তাতে সূচকীয় গতি আনার জন্য কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট প্রয়োজন।
আরও একটু সহজ করে বললে বলতে হয়, মনে করেন আপনি আমেরিকায় আছেন। আর আমি আছি বাংলাদেশে। আমাদের মধ্যে একটা ভৌগোলিক দূরত্ব রয়েছে। আপনি ঠিক করলেন, আপনার কয়েকটি বিশেষ গুণ, আপনার আচার, আচরণ আপনি আমাকে দিয়ে দেবেন। ভাল গুণগুলিই দেবেন বলে ঠিক করেছেন। তার জন্য অবশ্য অন্তত এক বার আমাদের দু’জনের সাক্ষাৎ হতে হবে। সাক্ষাতের পর ভাল লেগেছিল বলেই তো আমাকে আপনার কয়েকটি ভাল গুণ দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাতের পর হয় আপনি আমেরিকায় ফিরে গেলেন বা আমি বাংলাদেশে ফিরে এলাম। তার পর আপনি আপনার কয়েকটি গুণ আমাকে দিয়ে দিতে চাইলে, দিতে পারবেন। আমেরিকা থেকে বিমানে, পার্সেলে বা ক্যুরিয়ারে আমাকে পাঠাতে হবে না গুণগুলি। টেলিফোনে কথাও বলতে হবে খুব সামান্যই। সেগুলি খুব অল্প সময়ে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আমার মধ্যে এসে যাবে। তবে, আপনার বিমর্ষ হওয়ারও কারণ থাকবে সে ক্ষেত্রে। আপনার বাছাই করা যে ভাল ভাল গুণগুলি আপনি আমাকে ‘শেয়ার’ করলেন, সেগুলি কিন্তু আপনার মধ্যে থেকে ‘ভ্যানিশ’ হয়ে যাবে। ফলে, আপনি উল্টোটাও করতে পারেন। আপনার খারাপ গুণগুলিও আমাকে শেয়ার করতে পারেন। তাতে সেগুলি আর আপনাকে জ্বালাবে না! এই সব করতে টেলিফোনে সামান্য বাক্যালাপ ছাড়াও আমার ও আপনার মধ্যে একটা ‘কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট’ অবস্থা থাকতে হবে। যা আমার ও আপনার মধ্যে এক বারের সাক্ষাতেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মনের মিল বলতে পারেন। এক বারের সাক্ষাতে ভাল লেগেছিল বলেই তো আপনি আপনার কয়েকটি ভাল গুণ আমাকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন! মূলত এটি একটি কৌতূহলী ঘটনা যেখানে দুই বা ততোধিক কণা তথাকথিত এনট্যাঙ্গল অবস্থায় বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে একটি কণার উপর গৃহীত একটি পদক্ষেপ তাৎক্ষণিকভাবে সমগ্র জোটবদ্ধ সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং অন্য কণার আচরণের পূর্বাভাস দিতে পারে। যদি একজন পর্যবেক্ষক এই ধরনের একটি কণার অবস্থা নির্ধারণ করে, তবে এর সাথে এনট্যাঙ্গলে থাকা প্রতিকণাগুলি অবিলম্বে সেই অবস্থাকে প্রতিফলিত করবে-তারা পর্যবেক্ষকের মতো একই ঘরে বা মহাবিশ্বের বিপরীত দিকের একটি ছায়াপথে অবস্থান করলেও। চিন্তা করা যায়? ছায়াপথ থেকে ছায়াপথের দূরত্ব ও নিমেষেই কমিয়ে ফেলেছে এ আবিষ্কারের ধারণা। এই ঘটনাটি বর্তমানে আধুনিক কোয়ান্টাম প্রযুক্তির একটি অপরিহার্য গবেষণার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে দ্রুত হিসাব ও তথ্য প্রেরণের হাতিয়ার হিসেবে।
এবার এ গবেষণার একটু পেছন থেকে ঘুরে আসি। শুরুটা করেন আরেক নোবেল বিজয়ী মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন এবং তার সহকর্মী বরিস পোডলস্কি এবং নাথান রোজেন। তাদের দ্বারা প্রস্তাবিত একটি ধারণাকে সম্প্রসারিত করে, বেল দেখিয়েছিলেন যে যদি লুকানো কণাগুলি বিদ্যমান থাকে তবে তাদের উপস্থিতি পরীক্ষামূলকভাবে একাধিক এনট্যাঙ্গলে থাকা কণার সতর্ক পরিমাপের মাধ্যমে অনুমান করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যখন এই ধরনের কণার ঘূর্ণনগুলি বিভিন্ন দিকনির্দেশক অক্ষ বরাবর পরিমাপ করা হয় (অর্থাৎ, শুধুমাত্র ‘উপর’ বা ‘নিচে’ নয় বরং এর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থাও থাকে), সমষ্টিগত এনট্যাঙ্গল ঘূর্ণনের মধ্যে নির্দিষ্ট পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত যদি তারা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দ্বারা বিশুদ্ধভাবে নির্ণীত হয়। ১৯৬৯ সালে ক্লাজারই প্রথম একটি ব্যবহারিক পরীক্ষার ধারণা করেছিলেন, যেটি বিপরীত দিকে প্রবর্তিত এনট্যাঙ্গলড ফোটন জোড়ার মেরুকরণ নির্ধারণ করে কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট পরিমাপ করতে জড়িত ছিল। তারপরে তিনি ১৯৭২ সালে, প্রয়াত স্টুয়ার্ট ফ্রিডম্যানের সাথে স্নাতকের ছাত্র থাকা অবস্থায় পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন যে ফোটনগুলি তাদের শারীরিক বিচ্ছেদ সত্ত্বেও এনট্যাঙ্গলে ছিল। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতা হলো, বিজ্ঞানী ক্লজারের কাজ ইঙ্গিত দেয় যে লুকানো ভেরিয়েবলগুলি এনট্যাঙ্গলমেন্টের প্রভাবগুলি ব্যাখ্যা করতে পারে না। এর প্রায় ১০ বছর পরে, ক্লজারের পরীক্ষাকে পরিমার্জিত করে, বিজ্ঞানী অ্যাসপেক্ট এবং তার সহযোগীরা সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগে আটকে থাকা ফোটন জোড়ার দিক পরিবর্তন করার একটি উপায় তৈরি করে এবং তাদের একটিকে বন্ধ করে দেয়। এ পরীক্ষা ফোটন নির্গত হওয়ার সময় যে পরিমাপ সেটিংস বিদ্যমান ছিল তা চূড়ান্ত ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং লুকানো ভেরিয়েবলের অস্তিত্ব নেই এমন ধারণাটিকে ব্যাপকভাবে শক্তিশালী করে। আবদ্ধ কণার পরিমাপের সময় মৌলিকভাবে যাই ঘটুক না কেন, অ্যাস্পেক্টের কাজ দেখায় যে এটি বিদ্যমান কোয়ান্টাম তত্ত্বের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তা করে, যদিও তা নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। জেইলিঙ্গার এবং তার সহকর্মীরা আবদ্ধ কোয়ান্টাম অবস্থার ব্যবহার এবং অধ্যয়নকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছেন। ১৯৯৭ সালে তারা কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন নামক একটি ঘটনাকে স্বাধীনভাবে প্রদর্শন করেছিলেন, যা কোয়ান্টাম স্টেটগুলিকে নির্বিচারে দূরত্ব জুড়ে এক কণা থেকে অন্য কণাতে স্থানান্তরিত করার অনুমতি দেওয়ার জন্য এনট্যাঙ্গলমেন্ট ব্যবহার করে। বর্তমানে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন একটি বিশ্বব্যাপী ‘কোয়ান্টাম ইন্টারনেট’ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টার জন্য প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এর আগে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের সফল পরীক্ষা ঘরের মধ্যে করা হয়েছে। এর পর করা হয়েছে ২৫ কিলোমিটার এবং ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে। তার পর উপগ্রহের মাধ্যমে সেই বার্তা পাঠানো সম্ভব হয়েছে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরত্বেও। মজার ব্যাপার হচ্ছে চীনের মিসিয়াস মহাকাশযান প্রথম ‘কোয়ান্টাম যোগাযোগ উপগ্রহ’ তৈরিতে এ কৌশল সফলভাবে ব্যবহার করেছে। আর এ জন্যই পুরস্কার ঘোষণার সময়, পদার্থবিদ্যার নোবেল কমিটির সদস্য ইভা ওলসন বলেছিলেন, অ্যাসপেক্টস, ক্লজারস এবং জেইলিংগারের কাজ ‘অন্য জগতের দরজা খুলে দিয়েছে, এবং এটি আমরা কীভাবে পরিমাপকে ব্যাখ্যা করি তার ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিয়েছে’।
অতএব আমরা বলতে পারি সমষ্টিগতভাবে এ তিনজনের গবেষণা কোয়ান্টাম তথ্য বিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছে, যা কম্পিউটিং, যোগাযোগ এবং ক্রিপ্টোগ্রাফিতে সাফল্য অর্জনের জন্য কোয়ান্টাম নীতিগুলিকে কাজে লাগায়। তাদের তিনজনের এই গবেষণার উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। সাথে সাথে এই প্রত্যাশা করি কোয়ান্টাম কমিউনিকেশন এর মাধ্যমে আমরা অনেক দূর তথা অতীতের অনেক কিছু আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যতকেও আমরা উন্মোচিত করতে পারব। বিজ্ঞানীরা তাঁদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা দিয়ে আমাদেরকে সেই সুন্দর আগামীর কাছে নিয়ে যাবে -এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রফেসর, গণিত বিভাগ- চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।











