৭২৭ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প প্রস্তাব চবির ৫০ বছরের মাস্টার প্ল্যান

৩ হাজার কোটি টাকার একাধিক প্রকল্প ইউজিসিতে পাঠানোর উদ্যোগ

শামীম হোসাইন, চবি | বুধবার , ১৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছর মেয়াদি মাস্টার প্ল্যানের আওতায় প্রায় ৭২৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে আরো প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার একাধিক প্রকল্প ইউজিসিতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আলতাফউলআলম এ তথ্য জানিয়েছেন।

চলতি মাসের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের প্রকাশিত ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রস্তাবিত দুটি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৭২৭ কোটি ৪৮ লাখ ২১ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২০২৬২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৮২ কোটি ৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে এটি প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় নয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

দুটি প্রকল্পের মধ্যে ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ের ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পাশাপাশি গবেষণা অবকাঠামো, আবাসিক সুবিধা এবং ক্যাম্পাসের মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণে। ২য় বিজ্ঞান অনুষদ ভবন ও ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ ভবনের জন্য ১৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং একই পরিমাণ অর্থাৎ ১৩৭ কোটি ৫৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ২য় সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। ২য় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ভবন নির্মাণে ধরা হয়েছে ৮৩ কোটি ৫৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

ছাত্রীদের আবাসন সংকট কমাতে ১০ তলা একটি আবাসিক হল নির্মাণে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া ১০ তলা প্রশাসনিক (এনেঙ) ও সিনেট ভবনের জন্য ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ছাত্রীদের হলের প্রভোস্ট ও হাউস টিউটরদের জন্য পাঁচতলা আবাসিক ভবন নির্মাণে ৮ কোটি ৯৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। মাস্টারদা সূর্যসেন হলের দোতলা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণে প্রস্তাব করা হয়েছে ২ কোটি ৮৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

গবেষণা খাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের পরিকল্পনা। ৪৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নয় তলা সেন্টার ফর এঙিলেন্স ভবন এবং ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড অ্যাডভান্সড বায়োলজিকাল রিসার্চ ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ১২ কোটি টাকা এবং রাসায়নিক সংগ্রহে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জীববিজ্ঞান অনুষদের গবেষণা কার্যক্রমের জন্য অ্যানিমেল হাউস নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩৭ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

ক্যাম্পাসের যোগাযোগ ও ইউটিলিটি ব্যবস্থার উন্নয়নও রয়েছে প্রকল্পের আওতায়। অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণ ও প্রশস্তকরণে ১৬ কোটি ৫১ লাখ হাজার টাকা, বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন স্থাপনে ২১ কোটি ৬৪ লাখ ৫৮ হাজার টাকা, পানি সরবরাহ লাইন সংস্থাপনে ২ কোটি ২৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং গ্যাস পাইপলাইন সংস্থাপনে ১ কোটি ২৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানি রিজার্ভার নির্মাণে রাখা হয়েছে প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি এসটিপি, প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য ইউটিলিটি অবকাঠামোর জন্যও অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। তবে ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ টাকার এই প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আলতাফউলআলম জানান, প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পটি বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন রয়েছে।

টিএসসির জন্য প্রস্তাব ৪৯ কোটি টাকা : অন্য প্রকল্পটি হলো ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচারস্টুডেন্টস কমপ্লেঙ (টিএসসি) প্রতিষ্ঠাকরণ’। এর সম্ভাব্য ব্যয় ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা তৈরি, পাঠ ও গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, প্রকাশনা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং কোকারিকুলাম কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে টিএসসি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির ৪৬ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা ব্যয় হবে টিএসসি ভবন নির্মাণে। পাঁচতলা ভিত্তির ওপর চারতলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। বাকি ২ কোটি ৪৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা কনসালটেন্সি, বইপত্র ও সাময়িকী, আসবাবপত্র, অফিস সরঞ্জাম, প্রচারপ্রকাশনা এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ে ব্যবহারের জন্য ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্র জানায়, চবি থেকে প্রস্তাবিত হয়ে টিএসসি প্রকল্পটি প্রথমে ইউজিসিতে যায়। ইউজিসির অনুমোদনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর বর্তমানে প্রকল্পটি জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পাওয়ার পর প্রস্তাবটি প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন কমিটির (পিইসি) মাধ্যমে একনেকের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একনেকের অনুমোদনের পর প্রকল্পটির জন্য সরকারি বাজেট বরাদ্দের সুযোগ তৈরি হবে।

পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় করতে ৩ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা :

শুধু এই দুটি প্রকল্পে থেমে থাকতে চায় না চবি প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আরো একাধিক প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্‌ফোরকান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রায় ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ ধরে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব ইউজিসিতে পাঠানো হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদের জন্য পাঁচটি এবং ছাত্রীদের জন্য পাঁচটি ১০ তলা আবাসিক হল। বিদেশি শিক্ষার্থী এবং পিএইচডিমফিল গবেষকদের জন্য একটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া চারটি ১০ তলা একাডেমিক ভবন, ব্লুইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, কেন্দ্রীয় জাদুঘর ভবন এবং গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় ভবন নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি ক্রীড়া ও অন্যান্য সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল নির্মাণ, রসায়ন বিভাগের অ্যাডভান্সড রিসার্চ ল্যাব, অ্যঅডভান্সড রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিঙ, মডার্ন ল্যাঙ্গুয়জ ভবন এবং জৈব প্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণ। ইনস্টিটিউটটিতে জিনোম সিক্যুয়েন্সিং ও রেফারেল সেন্টার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

চবি ক্যাম্পাসে ৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। পাশাপাশি ডেকেয়ার সেন্টার, কয়েকটি বহুতল অফিস ভবন, টিচার্স ডরমেটরি, সোলার লাইটিংসহ ওয়াকওয়ে, ফুড কোর্ট ও ওয়েট মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত দুটি প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক, গবেষণা, আবাসিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অনেকটা কমবে।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্‌ফোরকান বলেন, শীঘ্রই উক্ত দুটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের বিষয়ে আমি আশাবাদী এবং এই বিষয়ে আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষদ্বয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি। উক্ত দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত, একাডেমিক এবং গবেষণা প্রতিবন্ধকতাসমূহ বহুলাংশে নিরসন হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকাধিক গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে পালাচ্ছিল কারটি
পরবর্তী নিবন্ধজৈব পচনশীল বস্তু থেকে বিষাক্ত গ্যাস?