জৈব পচনশীল বস্তু থেকে বিষাক্ত গ্যাস?

সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিলে দুর্ঘটনা

| বুধবার , ১৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের যে জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের প্রাণ গেছে, তার ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে নমুনা সংগ্রহের পর বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা হয়েছে, সেখানে জৈব পচনশীল কোনো বস্তু থেকে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হয়েছিল। ঘটনার চার দিন পর গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের গঠিত দুই তদন্ত কমিটি এবং বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিয়ে ওই জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক (জাহাজের জলাধার) পর্যন্ত পৌঁছান। সেখান থেকে বাতাস, মাটি ও পানির নমুন সংগ্রহ করেন তারা। যে ব্যালাস্ট ট্যাংক থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে শুক্রবার ৯ জনের মৃত্যু হয়, সেই ট্যাংকের বাতাসের নমুনা পরীক্ষা করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এদিন সেখানে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি মেলেনি। খবর বিডিনিউজের।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, আমরা নমুনা সংগ্রহ করেছি। শুধু ব্যালাস্ট ট্যাংকটি থেকে নয়, বিভিন্ন জায়গা থেকে। আজ অনেক কাজ করেছি। এখনো কাজ করছি। পরে বিস্তারিত বলতে পারব।

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন বলেন, সেখানকার মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেছি। আজ (গতকাল) সেখানকার বাতাস পরীক্ষা করে হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি মেলেনি। হয়তো কয়েকদিনের জোয়ারের পানিতে মিশে বা বাতাসের কারণে হাইড্রোজেন সালফাইডের পরিমাণ কমে গেছে। তিনি বলেন, সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষা করার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।

জৈব পচনশীল বস্তু থেকে বিষাক্ত গ্যাস? : জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য ব্যালাস্ট ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখতে হয়। নৌযান চলাচলের নিয়ম অনুসারে একটি আন্তর্জাতিক সীমা থেকে অন্য একটি আন্তর্জাতিক নৌ সীমায় প্রবেশ করতে হলে জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি পাল্টে নতুন ব্যালাস্ট ওয়াটার নিতে হয়। ‘এমটি রাসি’ নামের প্রায় ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের জাহাজটি গত বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য নিয়ে আসা হয়।

ভাঙার জন্য তীরে ভেড়ানোর সময় জাহাজটির চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংক পানিতে পূর্ণ ছিল। জাহাজটি ভাঙার কাজ প্রায় শেষ দিকে হওয়ায় একে একে ব্যালাস্ট ট্যাংকগুলো কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই জাহাজের চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের মধ্যে একটি আগে কাটা হয়েছে। দ্বিতীয়টি গত শুক্রবার কাটার কাজ চলছিল। সে সময় বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়। অন্য দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংক এখনো পানি ভর্তি অবস্থায় আছে।

দুর্ঘটনার পর জাহাজটি পরিদর্শন করা বিস্ফোরক অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, জাহাজটির ওই ব্যালাস্ট ট্যাংকে জমে থাকা হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের কারণে এই প্রাণহানি ঘটে। উচ্চ মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস প্রাণঘাতী। এটি পানিতে মিশে থাকে এমন একটি গ্যাস। ওই ঘটনা তদন্তে এখন পর্যন্ত দুটি সরকারি তদন্ত কমিটি ও একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

একটি তদন্ত কমিটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দুর্ঘটনা ঘটা ব্যালাস্ট ট্যাংকটিতে আজ আমরা কোনো রাসায়নিক বর্জ্য বা পয়ঃবর্জ্য পাইনি। তবে এখনই বলা যাবে না সেখানে এ রকম বর্জ্য ছিল কি না। ওই ব্যালাস্ট ট্যাংকটিতে এক বছর ধরে পানি জমে ছিল। সেখানকার মাটির নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেলে সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে। নমুনায় যদি অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বা এ রকম উপকরণ পাওয়া যায়, তাহলে বোঝা যাবে সেখানে কী রকম বর্জ্য ফেলা হয়েছিল।

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে যেটা হতে পারে, সমুদ্রের পানিতে বিভিন্ন রকম সামুদ্রিক শৈবাল, ফাইটো প্লাংকটন, জুওপ্লাংকটন ও ব্যাকটেরিয়া থাকে। সালফার নিঃসরণ করে এমন ব্যাকটেরিয়া যদি ওই পানিতে বেশি পরিমাণে থাকে, তাহলে সেই সালফার হাইড্রোজেনের সাথে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরি করতে পারে। যে উচ্চ মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড সেখানে ছিল সেটা বিস্ময়কর। কোনো ধরনের জৈব পচনশীল বস্তু থেকে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। তবে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল না দেখে এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব না।

ওই জাহাজের অবশিষ্ট দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংকে হাইড্রোজেন সালফাইড বা অন্য কোনো বিষাক্ত গ্যাস আছে কি না তাও খতিয়ে দেখবে বিশেষজ্ঞ কমিটি ও তদন্তকারী দল।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭২৭ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প প্রস্তাব চবির ৫০ বছরের মাস্টার প্ল্যান
পরবর্তী নিবন্ধ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০৬টি খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন