১১ বছর আগের ঘটনা সালাহউদ্দিনের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল

| রবিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ

নিজের গুম হওয়ার ঘটনা মনে হলে এখনও মনের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের। তার ভাষায়, ১১ বছর আগের ঘটনা স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করে; এখনও স্মরণে এলে শরীরে শিহরণ জাগায়। চোখ বাঁধা কালো কাপড়ে, হাত বাঁধা স্টিলের হ্যান্ডকাফে। এক নয়, দুই নয়, দশ নয়, টানা ৩২ ঘণ্টা এভাবে কেটেছে আমার। সেই স্মৃতি এখনও আমাকে কষ্ট দেয়, মনের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসের আগের দিন গতকাল ১১ বছর আগের স্মৃতিচারণে এসব কথা বলেন তিনি। খবর বিডিনিউজের।

২০১৫ সালের ১০ মার্চ গুম হন সালাহউদ্দিন আহমদ। ৬৩ দিন পর তাকে পাওয়া যায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে। আইনি জটিলতা ও মামলা মোকাবিলার কারণে তিনি প্রায় নয় বছর সেখানে অবস্থান করেন। দেশে ফেরার পথ সুগম হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। যখন সালাহ উদ্দিন গুম হন তখন তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। কিছুদিন পর তাকে করা হয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। এরপর গত ফেব্রুয়ারির ভোটে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে দেওয়া হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব।

তিনি বলেন, উত্তরার একটি বাসা থেকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে সাদা পোশাকে অস্ত্রধারীরা তুলে নিয়ে যায়। কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে ফেলে, হাত বেঁধে ফেলে। তারপরের ঘটনাগুলো আরও ভয়ংকর। আমাকে রেখেছিল পাঁচ ফিটের একটি কুঠরিতে। ৬১ দিন। এই ৬১টি দিন কখন রাত, কখন দিন কিছুই আমি জানতে পারিনি।

তিনি বলেন, ওখানে খাবার দেওয়ার জন্য একটি জায়গা ছিল দরজার নিচে। বাইরে ফ্যান ছিল, আওয়াজ হতো বায়ু সঞ্চালনের জন্য। আমাকে কখনো ওখান থেকে বের করেনি, কেবল রুম পরিষ্কারের জন্য বের করেছিল দরজার বাইরে। প্রতি মুহূর্তে আমি মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম।

তিনি বলেন, এখন যে আয়নাঘরের বর্ণনা গণমাধ্যমে বেরিয়ে আসছে, আমরা সেই বন্দিজীবন তার চেয়ে কঠিন অবস্থার। বর্ণনা করলে শরীরে যেন একরকম কাঁপুনি ধরে।

ভারতের পুলিশের হাতে বন্দি হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যেদিন আমাকে আয়নাঘর থেকে বের করে নিয়ে গেল, সেদিন দীর্ঘ একটা যাত্রা। চোখ বেঁধে, হাত বেঁধে, তারপর শিলংয়ের একটি জায়গায়, এটাকে গলফ মাঠ বলা হয়। সেখানে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, ইউ আর ফ্রি নাউ। দীর্ঘ ৯ বছর তিন মাস বা চার মাস হলো, যখন আইনিভাবে দেশে ফেরার চেষ্টা করছিলাম, তখন ভারত সরকার আবার আমার খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করে।

তিনি বলেন, সেই আপিল আদালত খারিজ করার পর সরকারকে নির্দেশনা দিল যে, এই লোককে তার দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় পাঠান। আমার মতো অনেকেই আমার সহকর্মীদের মধ্যে, রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে, এমনকি সাংবাদিকরাও এই গুমের শিকার হয়েছেন। তারা অনেকেই আমার মতো সৌভাগ্যবান হননি যে বেঁচে আছেন বা তাদের খুঁজে পাওয়া গেছে। সেই দিক থেকে আমি অনেক সৌভাগ্যবান, মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি অবণত চিত্তে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা গুম হয়ে আছেন, সেসব পরিবারের বেদনা আমার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করলে আপনারা জানতে পারবেন। যারা এখনও গুম হয়ে আছেন, আপনি তাদের সঙ্গে কথা বলেন, বুঝতে পারবেন তাদের বুকের ভেতরের কান্নার কথা। অবর্ণনীয় অসহনীয় দুঃখযন্ত্রণার কথা। একজন মানুষ যদি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন, তার দাফন হয়, তাকে স্মরণ করে, কবর জিয়ারত করার সুযোগ পায় তার পরিবার। কিন্তু গুম হলে কিংবা খুঁজে না পাওয়া গেলে এই সুযোগটাও একজন মানুষের যখন থাকে না, তখন তাদের বেদনা, তাদের পরিবারের কষ্ট যে কত গভীর হতে পারে, সেটা কোনো ভাষায় বলে ব্যক্ত করা যাবে না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তবে একটা কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে চাই, এ দেশের মাটিতে ইনশাআল্লাহ, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাগুমের বিচার হবে। আয়নাঘরের বন্দিশালা তৈরি করে যারা ভিন্নমতকে দমনের কুশীলব, তাদের রেহাই নেই, অবশ্যই অবশ্যই তাদের আদালতের মাধ্যমে বিচার করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকন্টেনার পরিবহন বেড়েছে, তবুও আগের অবস্থানে চট্টগ্রাম বন্দর