প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি নৈসর্গিক শোভায় সজ্জিত পার্বত্য চট্টগ্রামের মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ী গ্রাম সালদা। এ সালদার পাহাড়ী ঝর্ণা হতে নেমে আসা ছড়া সালদা হতে হালদা নদীর উৎপত্তি হয়ে উত্তর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, নাজিরহাট, হাটহাজারী, রাউজান হয়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাটের কাছে কর্ণফুলী নদীর সাথে মিশে গেছে। এটি বাংলাদেশেই উৎপত্তি এবং বাংলাদেশেই শেষ। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৮১ কিলোমিটার। ২৯ কিলোমিটার নৌযান চলাচলের উপযোগী থাকে সারা বছর। হালদা নদীর গভীরতা ২১ ফুট বা ৬.৪ মিটার
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের একমাত্র ভারতীয় কার্প প্রজননের ক্ষেত্র হিসেবে এই হালদা নদী বিখ্যাত। আমাদের জাতীয় রুই মাছ ডিম ছাড়ে এবং নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও রুই কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস ও কার্প জাতীয় মা মাছ প্রচুর পরিমাণ ডিম ছাড়ে বিশেষ মুহূর্তে ও বিশেষ পরিবেশে।
মা মাছেরা বিশেষ করে এপ্রিল হতে জুন পর্যন্ত অমাবস্যা বা পূর্ণিমা তিথির অনুকূল পরিবেশে ডিম ছাড়ার উপর্যুক্ত সময় মনে করে। সে সময় প্রচুর বজ্রপাতসহ বৃষ্টিপাত হতে হয়। স্থানীয়দের ভাষায় এই সময়কে ‘জো’ বলে। জো এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হল নদীর জোয়ার–ভাটা। মা মাছেরা জোয়ার–ভাটার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পূর্ণ জোয়ারের শেষে বা পূর্ণ ভাটার শেষ পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে। মা মাছেরা ডিম ছাড়ার পূর্বে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প ডিম ছাড়ে। ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ যদি না থাকে তখন মা মাছ নিজের ডিম দেহের মধ্যে নষ্ট করে ফেলে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে মাছের প্রজনন হার আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। ১৯৪৬ সালের দিকে কার্প জাতীয় মাছ রুই, কাতলা, মৃগেল ও গলদা চিংড়ির ডিমের উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ হাজার কেজি। আর বর্তমানে তা কমে এসেছে মাত্র ১০০ কেজিতে। তাঁর মূল কারণ হলো সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, মা মাছ শিকার, বাঁক কাটা, নদী ভরাট, নদী দূর্ষণ, ইঞ্জিন চালিত নৌকা, কারখানার বর্জ্য নিষ্কাষণ ও সরকারের উদসীনতাসহ নানা কারণে আমাদের প্রাকৃতিক এ মৎস্যভাণ্ডার ধ্বংস হতে চলেছে, ফলে দিন দিন মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।
বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যের তালিকায় রয়েছে আমাদের কক্সবাজার ও সুন্দরবন। এ দুটিকে ঘিরে আমাদের দেশের মানুষের প্রবল আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি মানুষের অসীম মমতা ও ভালোবাসা রয়েছে। কক্সবাজার ও সুন্দরবন ছাড়াও আমাদের দেশে যে প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য রয়েছে তা বিশ্ব দরবারে ঐতিহ্য রক্ষার দাবি জানাতে পারি। তেমনি এক ঐতিহ্যের নাম হলো ‘হালদা নদী’।
ইউনেস্কোতে বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের যোগ্যতা অর্জন করার জন্য চারটি শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটি শর্ত পূরণ করতে পারলে প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হালদা নদীর দুটি শর্ত সম্পূর্ণ এবং একটি আংশিক পূরণ করা আছে। এই ক্ষেত্রে হালদা নদী জাতীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের যোগ্যতা রাখে। স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের এ প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সম্পদকে রক্ষা করার জন্য আমাদের সকলের আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।














