সন্ধ্যায় আসে হাজারো টিয়া, ভোরে ফেরে বনে

খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ে লাল বুক টিয়ার নিরাপদ আবাস

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

খাগড়াছড়ির বুকে যেন গড়ে উঠেছে লাল বুক টিয়ার গ্রাম। শহরের ছোট্ট সবুজ বনে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে হাজারো লাল বুক টিয়া। শিকারিদের উৎপাত না থাকা এবং বন বিভাগের তৎপরতায় নিরাপদ আবাসস্থল পাওয়ায় এক দশকের বেশি সময় ধরে খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের বড় বড় গাছে আবাস গড়ে তুলেছে পাখিগুলো। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় টিয়াদের কলকাকলি। সবুজ দেহ, বুকে লাল রং আর পালকে একচিলতে হলুদদুর্লভ সৌন্দর্যের লাল বুক টিয়ার এমন দৃশ্য দেখা যায় খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ে। পাখিগুলোর মিষ্টি সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

স্থানীয়রা জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে এখানে আবাস গড়ে তুলেছে লাল বুক টিয়াগুলো। মূলত নিরাপদ পরিবেশ এবং শিকারিদের উৎপাত না থাকায় বছরের পর বছর ধরে তারা এ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। পাখি শিকার বন্ধে বন বিভাগের কর্মীরাও নিয়মিত পাহারা দিচ্ছেন।

খাগড়াছড়ি সদর রেঞ্জ কার্যালয়ের বনকর্মী মো. নুরউদ্দিন হোসেন বলেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় রেঞ্জ ক্যাম্পাসে প্রচুর টিয়া পাখি আসে। তারা সারা রাত এখানে অবস্থান করে। ভোরে ফজরের আজানের সময় খাবারের খোঁজে চলে যায়। প্রতিদিন অনেক পর্যটক এখানে আসেন এবং পাখিগুলোর অবস্থান দেখেন। টিয়াদের কলকাকলিতে অফিস প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত থাকে।

আরেক বনকর্মী মো. সালাউদ্দিন খান বলেন, আশপাশের কেউ পাখিগুলোকে বিরক্ত করলে বা গুলতি নিয়ে এসে পাখি শিকারের চেষ্টা করলে তা করতে দেওয়া হয় না। বিষয়টি কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে এত বড় বন থাকার পরও টিয়াগুলো বন বিভাগের কার্যালয় চত্বরকে নিরাপদ মনে করে। এখানে দিনরাত পাহারা দেওয়া হয়। কোনো শিকারিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। তিনি আরও বলেন, আশপাশের কেউ শিকার করতে এলে তাদের প্রতিহত করা হয়। পাখিগুলো সন্ধ্যায় এখানে এসে বিশ্রাম নেয়। ভোরে খাবারের খোঁজে চলে যায়। এভাবেই জায়গাটি টিয়াদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গড়ে উঠেছে।

খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় কয়েক বছর ধরে কাজ করছে বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি। সংগঠনটির সংগঠক সাথোয়াই মারমা বলেন, পাখি প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লোকালয়ে শিকারির উপস্থিতি কম থাকায় লাল বুক টিয়াগুলো মানুষের পাশাপাশি নিরাপদে বসবাস করতে পারছে।

তিনি বলেন, এসব পাখির আবাসস্থল রক্ষার পাশাপাশি তাদের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে বট, পাকুড়, উদাল, জাম ও ডুমুরসহ বিভিন্ন ফলদ ও দেশীয় প্রজাতির বড় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সাথোয়াই মারমা আরও বলেন, এটি খুব আশাজাগানিয়া বিষয়। যেখানে পাহাড় থেকে টিয়া পাখি হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে একসঙ্গে এত টিয়ার আবাস সত্যিই মুগ্ধকর। এখানে হাজার হাজার পাখি আবাসস্থল গড়ে তুলেছে।

এদিকে লাল বুক টিয়া বা মদনা টিয়ার সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারার পাশাপাশি পাখির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগিয়ে বন সৃজনের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা। তিনি বলেন, বন বিভাগের এই ক্যাম্পাসে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও পাখি রয়েছে। ছোট জায়গা হলেও এখানে পাখিদের কেউ উত্ত্যক্ত বা বিরক্ত করতে পারে না। পাখির বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও খাদ্যের ব্যবস্থা করতে ক্যাম্পাসে খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো হয়েছে। শিকার ঠেকাতে বন বিভাগের কর্মীরা সার্বক্ষণিক পাহারা দেন।

ফরিদ মিঞা বলেন, এ কারণে টিয়াগুলো বন বিভাগের ক্যাম্পাসে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘোরাফেরা করছে। তিনি জানান, লাল বুক টিয়া বা মদনা টিয়া ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইনে সংরক্ষিত প্রজাতি। কেউ এ পাখি শিকার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅবশেষে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো ঢেমুশিয়া বদ্ধ জলমহাল
পরবর্তী নিবন্ধগণভোটের রায় ও জুলাই সনদ নিয়ে সরকার জনমনে অনাস্থা বাড়িয়ে চলেছে : মঞ্জু