শুধু আইন নয়, মানসিকতার বদলই রুখতে পারে যৌন নিপীড়ন

ইমরান এমি | মঙ্গলবার , ৯ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএস এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কন্যা শিশুদের পাশাপাশি ছেলে শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে যৌন হয়রানির, যার একটি বড় অংশ ঘটছে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ছেলে শিশুরা কখনো শিক্ষক দ্বারা আবার কখনো আশপাশের মধ্যবয়স্কদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। ছেলেরা যে যৌন হয়রানির শিকার হয়, তা আমরা অনেকেই জানি না বা স্বীকার করতে চাই না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনা ঠেকাতে বা প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো আইনি ব্যবস্থা রয়েছে কি? বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। তবে সমপ্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, এ ধরনের ঘটনায় আইন সংশোধন করে হলেও দ্রুত সময়ে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হবে ও বিচারকাজ দ্রুত করা হবে। জনগণের দাবি, আইনের মাধ্যমে দ্রুত সময়ে এসব ঘটনায় অভিযুক্ত নরপশুদের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হোক। বিলম্বিত বিচার এবং তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার কারণে ধর্ষণের ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অতীতে এমনও ঘটনা ঘটেছে যেখানে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে এসব মামলা, যা বাদীপক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং সমাজে এক ধরনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ তৈরি করে। যখন অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয় বা অপরাধী পার পেয়ে যায়, তখন অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধীরাও উৎসাহিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নারীর নিরাপত্তা মানে সমাজের নিরাপত্তা। প্রতিটি শিশু, প্রতিটি নারীকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক দায়িত্ব। কন্যাশিশুরাই বড় হয়ে এক দিন মা হবে। তাই যত্ন ও নিরাপত্তা দিয়ে তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে না পারলে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে। কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু আইন দিয়ে নয়, সম্মিলিতভাবে সরকার ও সুশীল সমাজকে এ নিয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের দায়িত্ব অপরিসীম।

যৌন হয়রানি রোধে অবাধ ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শিশু ধর্ষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। একইসাথে যৌন নিপীড়ন থেকে শিশুদের বাঁচাতে হলে স্কুলকলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন বিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সেইসঙ্গে সামাজিক বেড়াজাল ছিন্ন করে সবাইকে খোলামেলাভাবে এইসব নিয়ে জানাতে হবে, যাতে শিশুরা নিজেদের সমস্যার কথা নিজেরাই বলতে পারে এবং কখনো নিপীড়িত হলে তার প্রতিবাদ করতে পারে। তার জন্য পরিবার থেকে আগে থেকেই তাদের সচেতন করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কোনো সময় যদি নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, তা গোপন না করে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে হবে এবং অপরাধীর পরিচয় উন্মোচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে পরিবার, সমাজ তথা সবাইকে। ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার মানসিকতা পরিহার করে আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কাছের মানুষ তথা পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধপারিবারিক শিক্ষাই সুন্দর রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারে