লালদিয়া হবে দেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন পরিচয়

ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ । চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্ত হবে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা

হাসান আকবর | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ

কর্ণফুলী নদীর তীরে ছোট্ট লালদিয়া চর। এতদিন বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বড় কোনো পরিচিতি ছিল না জায়গাটির। এবার সেই লালদিয়াই বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের নতুন পরিচয়ের অংশ হতে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস এখানে গড়ে তুলছে একটি আধুনিক গ্রিনফিল্ড কন্টেনার টার্মিনাল। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে নির্মিতব্য এ টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্ত হবে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানিরপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালস এবং স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কন্টেনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পাবলিকপ্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর এ প্রকল্পে টার্মিনালটি নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। বন্দর কর্তৃপক্ষ জমির মালিকানা ধরে রাখবে। ৩০ বছরের কনসেশন মেয়াদ শেষে কার্যক্রমের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এপিএম টার্মিনালসের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে নৌ পরিবহন মন্ত্রী বলেছিলেন, টার্মিনালটি হবে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন টার্মিনাল’। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবং ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সক্ষমতা ও প্রযুক্তি। প্রকাশিত নকশা অনুযায়ী লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপটুশোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবারটাইয়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন (ইআরটিজি) এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর। থাকবে ৬১৩ মিটার দীর্ঘ কন্টেনার জেটি। টার্মিনালটি ১০ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কন্টেনার জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে।

এখানেই লালদিয়া টার্মিনালের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন মন্তব্য করে সূত্র বলেছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আকারের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় কন্টনার জাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না। এপিএম টার্মিনাল লালদিয়ায় সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউএস জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে, যা বিদ্যমান সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়। ফলে ফিডার নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে সময় ও লজিস্টিক ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও শিপিং বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, টার্মিনালটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হবে। পুরো প্রকল্পটি বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত ও পরিচালিত হবে; সরকারের পক্ষ থেকে মূলধনী বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেশে আসবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও এ প্রকল্প থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ৮ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতিটি কন্টেনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ মার্কিন ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত ২৩ ডলার করে পাবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর এককালীন ২৫০ কোটি টাকা প্রদান করা হবে। তবে প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তির সব শর্ত এখনো প্রকাশ করা হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে ইতোমধ্যে ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, একটি বিশ্বখ্যাত টার্মিনাল অপারেটরের সরাসরি বিনিয়োগ বাংলাদেশের বন্দর খাতে বিদেশি বিনিয়োগের আস্থা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে টার্মিনাল পরিচালনায় প্রতিযোগিতা তৈরি হলে সেবার মান, সময় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমদানিরপ্তানিকারকেরা সুবিধা পেতে পারেন।

চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বেসরকারি খাতে দেশিবিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো উচিত। বিশ্বের একটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রকল্প করছেএটি দেশের জন্য গৌরবের। লালদিয়া প্রকল্পকে তিনি বাংলাদেশের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন অপারেটরের সেবার মান ও ব্যয়ের তুলনা করার সুযোগ তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীরাই ভালো সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।

ব্যবসায়ী নেতা খায়রুল আলম সুজন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। ব্যবসায়ীরা কম সময়ে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ভালো সেবা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও রপ্তানিসব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আধুনিক কন্টেনার টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাঁর মতে, লালদিয়া টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা ও ব্যয়প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এপিএম টার্মিনালসের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাও প্রকল্পটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ৬০টির বেশি দেযে টার্মিনাল পরিচালনা করে। এপিএম টার্মিনালস তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দক্ষ কন্টেনার বন্দরের ১০টিতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। লালদিয়াকে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক, কম কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানিসাশ্রয়ী টার্মিনালের একটি প্রদর্শনী প্রকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইনে। পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য কিংবা হালকা প্রকৌশলরপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। বড় জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভেড়ার সুযোগ এবং দ্রুত কন্টেনার ওঠানামা করা গেলে পণ্য পরিবহনে অপেক্ষার সময় কমতে পারে। সরকারি পিপিপি কর্তৃপক্ষও প্রকল্পটির অন্যতম সুবিধা হিসেবে দ্রুততর জাহাজ পরিচালনা, ডুয়েল টাইম কমানো এবং লজিস্টিক ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে।

লালদিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নির্মাণ, ট্রাকিং, গুদামজাতকরণ, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং ও সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ব্যবসায় কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকক্সবাজারে তিনটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ