নেপালে ভয়াবহ বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ৫৭৯

নিখোঁজ প্রায় দুই হাজার ফের বন্যার শঙ্কা, তিব্বত সীমান্তে পাহাড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন মানুষ

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ২৯ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ

নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। বন্যার দুই দিন পরও নিখোঁজ ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন বহু মানুষের সন্ধান না মেলায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে চীন সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ফলে নদীর গতিপথে তৈরি হওয়া একটি বিশাল হ্রদের পানি উপচে পড়ায় নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার।

গত বুধবার নেপালচীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা দেখা দেয়। পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দেয়। পরে সেই প্রবল স্রোত ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে মানুষ, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যায়।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিলেন। তাদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, এই ভয়াবহ দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বন্যার প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশ মূল দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরে ভাটির বিভিন্ন জেলায় গিয়ে পৌঁছেছে। এখন রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপরাসি এলাকায় মরদেহ উদ্ধার করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২২১ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে চিতওয়ান জেলা থেকে। জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৭৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া উদ্ধার ও সরকারি দায়িত্বে থাকা ১০৫ জনও নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫ জন, পুলিশের ২৮ জন, কাস্টমস কার্যালয়ের ১৫ জন, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৩ জন এবং অভিবাসন কার্যালয়ের চারজন রয়েছেন।

দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালাতে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর মোট ১৪ হাজার ৮২৯ সদস্যকে মোতায়েন করা হয়েছে। হেলিকপ্টারে করে তিন হাজার ৭৪২ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী ও বেসরকারি অপারেটররা এ কাজে ৭৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। তবে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি এখন বড় সংকট হয়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক মরদেহ সংরক্ষণ ও শনাক্ত করা। চিতওয়ানে দুই শতাধিক মরদেহ উদ্ধার হলেও জেলার হাসপাতালগুলোর মর্গে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ভারতপুরে একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ২৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব হবে। নাওয়ালপরাসি পূর্ব জেলাতেও একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সেখান থেকে মরদেহ পোখারা, বুটওয়াল, ভৈরহাওয়া ও পালপায় পাঠানো হয়েছে। কাওয়াসোটির একটি কমিউনিটি ফরেস্ট হলও অস্থায়ী মর্গ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূমিধসে চীনের তিব্বত অংশে ছোচেন খোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে একটি বড় হ্রদ তৈরি হয়েছে। সেখানে পানি জমে জলাধারের পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার পানি উপচে পড়তে শুরু করে। এতে ভোতেকোশি নদীতে পানির স্তর বাড়ার আশঙ্কায় সীমান্ত এলাকার মানুষকে নদী থেকে দূরে সরে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নতুন এই ঝুঁকির কারণে উদ্ধার অভিযানও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় আবার উদ্ধারকাজ শুরু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।

বিদেশি নাগরিকদের বিপুলসংখ্যক নিখোঁজ থাকার ঘটনায় উদ্ধার অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও পড়েছে কাঠমান্ডু। শুরুতে বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে নেপালে প্রবেশের অনুমতি না দিলেও পরে সীমিত পরিসরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে রাজি হয়েছে নেপাল সরকার। সরকারি সূত্রের বরাতে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভারত, চীন, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশেষজ্ঞ দলকে সীমিতভাবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। এছাড়া ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষায়ও বিদেশি প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকার রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলাকে তাৎক্ষণিক এক কোটি নেপালি রুপি করে এবং ধাদিং জেলাকে ৫০ লাখ রুপি সহায়তা দিয়েছে। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ট্রাক ও বিমান কার্গোও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। ভারত অতিরিক্ত মানবিক সহায়তা পাঠাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। তবে দুই দিন পেরিয়ে গেলেও পুরো দুর্যোগ পরিস্থিতির চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। একদিকে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে, অন্যদিকে ক্রমেই বাড়তে থাকা মরদেহের সংরক্ষণ ও শনাক্তকরণ এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কা নেপাল সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধউদয়ন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে পাথর নিক্ষেপ, আটক ১