আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়া, উত্তাল সাগর এবং সিরিয়ালবিহীন জাহাজ চলাচলের কারণে সংকটে পড়েছে লাইটারেজ জাহাজ সেক্টর। কাজ ও ভাড়ার অভাবে শত শত লাইটারেজ জাহাজ কর্ণফুলী নদী ও পতেঙ্গা উপকূলে অলস অপেক্ষা করছে। এতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা নিয়ে সাধারণ জাহাজ মালিকদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, জুন ক্লোজিংয়ের পর স্বাভাবিকভাবে আমদানি কিছুটা কমে যায়। এতে করে লাইটারেজ জাহাজগুলো পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য পায় না। পুরো মাসে এক ট্রিপ জাহাজ চালানোর মতো পণ্যও অনেক সময় থাকে না। কিন্তু এবারের সংকটকে আরো তীব্র করেছে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) নিয়ন্ত্রিত সিরিয়াল ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত কিছু লাইটারেজ জাহাজ। প্রভাবশালীদের জাহাজগুলো সিরিয়াল না মেনে চলাচল করছে। নেতাদের একেকটি জাহাজ দুই–তিন ট্রিপ পণ্য পরিবহন করছে। অন্যদিকে সাধারণ জাহাজ মালিকদের জাহাজগুলো অলস ভাসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের আমদানি বাণিজ্যের প্রায় ১০ কোটি টন পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উড পাল্পসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে আসে। ড্রাফটের কারণে এসব জাহাজ জেটিতে ভিড়তে না পারায় বহির্নোঙরে গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করা হয়। একটি মাদার ভ্যাসেলের সঙ্গে একযোগে তিন–চারটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা থাকে। পরে এসব পণ্য কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পৌঁছে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন শিল্প গ্রুপের মালিকানাধীন জাহাজগুলো ছাড়া বাকি লাইটারেজ জাহাজগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করে বিডব্লিউটিসিসি। প্রতিদিন বার্থিং সভার মাধ্যমে কোন মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে কতটি লাইটারেজ জাহাজ যাবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত ৪শ লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল ছাড়া চলাচল করছে। তারা বিডব্লিউটিসিসির কাছ থেকে সিরিয়াল নিচ্ছে না। প্রভাবশালী জাহাজ মালিকদের এসব জাহাজ একের পর এক ট্রিপ মারলেও সাধারণ জাহাজ মালিকরা তাদের জাহাজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। সিরিয়ালভুক্ত সাধারণ জাহাজগুলো দিনের পর দিন কোনো ভাড়া পাচ্ছে না। কাজের অভাবে শত শত লাইটারেজ জাহাজ অলস পড়ে আছে। কর্ণফুলী নদী, পতেঙ্গা উপকূল এবং আশপাশের নোঙর এলাকায় অসংখ্য জাহাজ ভাড়া না পেয়ে অপেক্ষা করছে। অনেক জাহাজ সপ্তাহের পর সপ্তাহ অলস পড়ে থাকায় মালিকদের ঋণের কিস্তি, নাবিকদের বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও ব্যাংক সুদ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। জুন মাসের ক্লোজিং শেষে প্রতি বছর কিছুটা আমদানি কমে। ফলে পণ্য পরিবহনের চাহিদাও কমে যায়। কিন্তু সিরিয়ালবিহীন জাহাজ পরিচালনা এবার পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে বলে তারা উল্লেখ করেন। একাধিক জাহাজ মালিক অভিযোগ করেন, যদি স্বচ্ছভাবে সিরিয়াল অনুসরণ করে জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ জাহাজ মালিকরাও কাজ পাবেন।
এ বিষয়ে বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ আজাদীকে বলেন, সাগর উত্তাল। তিন নম্বর সিগন্যাল চলছে। কোনো জাহাজই সাগরে যেতে পারছে না। তাই অলস জাহাজের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে চোখে পড়ছে। জুন ক্লোজিংয়ের পর আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সময় এমনিতেই কাজ কম থাকে। সিরিয়ালবিহীন জাহাজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকেই চুরি করে সিরিয়ালবিহীন জাহাজ পরিচালনা করছে। বিষয়টি বিডব্লিউটিসিসির নজরে এসেছে। আমরা চিন্তাভাবনা করছি। সব জাহাজ যাতে সমানভাবে কাজ পায় সেটি নিশ্চিত করা হবে।












