ভূমিকা: ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে যুগে যুগে এমন মহামানবের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা দ্বীনের খিদমতে নিজেদের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদেরই একজন আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি। তিনি শুধু একজন আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না, বরং যুগের সংস্কারক, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের একনিষ্ঠ সেবক এবং মুসলিম জনতার দিশারী।
বংশ পরিচয় ও জন্ম: আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৩৩৬ হিজরি মোতাবেক ১৯১৬ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন উত্তর–পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জেলার সিরিকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত অলী–ই কামিল কুতুবুল আউলিয়া আল্লামা সৈয়দ আহমদ শাহ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির দ্বিতীয় পুত্র। বংশপরম্পরায় তিনি রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’র পবিত্র বংশধর এবং পিতৃ–মাতৃ উভয় দিক থেকেই সৈয়দ বংশীয়।
শিক্ষাজীবন: প্রাথমিক শিক্ষা তিনি পিতার নিকট লাভ করেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। হিফজকালে এক ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য–তাঁর শিক্ষক স্বপ্নে রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’র নূরানী দর্শন লাভ করে জানতে পারেন যে, ছাত্রদের মধ্যে একজন রাসূলে পাকের বংশধর আছেন। শিক্ষক সব ছাত্রকে একটি করে কমলা দিয়ে বলেন, “এমনভাবে খাও যাতে কেউ দেখতে না পায়।” অন্যান্য ছাত্র কমলা খেয়ে এলে শিশু তৈয়্যব শাহ কমলা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, “আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জায়গায় আছেন।”
কুরআন হিফজের পর তিনি প্রায় ১৬ বছর ইসলামী জ্ঞান–বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসূল, নাহু, সরফ, মানতিক, আক্বাইদ, দর্শন, হিকমত, আরবী ও উর্দু সাহিত্য, তাসাউফ, মারিফাত, ত্বরীকতে তিনি অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী হন। ২৭ বছর বয়সে যাহিরী জ্ঞানার্জন সম্পন্ন করেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে আল্লামা হাফেজ আবদুর রহমান ও আল্লামা হাফেজ আবদুল হামিদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আধ্যাত্মিক জীবন ও খিলাফত লাভ : স্বীয় পিতার হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে তিনি ইবাদত–বন্দেগী, যিকির–আজকার, মুরাকাবা–মুশাহাদা ও রিয়াজতের মাধ্যমে ত্বরীকতের উচ্চ স্তরে আরোহণ করেন। ১৯৫৮ সালে পিতা তাঁকে ‘খলীফায়ে আযম’ উপাধিতে ভূষিত করে সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার জানশীন হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেন। পরবর্তীতে তিনি বেলায়তে ওজমা ও গাউসে জামানের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন।
বাংলাদেশে আগমন ও দ্বীনি খিদমত : ১৯৪২ সালে ২৬ বছর বয়সে সর্বপ্রথম চট্টগ্রাম আগমন করেন। ১৯৬১ সালে পিতার ইন্তেকালের পর বাংলাদেশে এসে শরীয়ত ও ত্বরীকতের দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম আগমন ১৯৭৬ সালে; ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত এ দেশে এসে ইসলামের সঠিক আক্বীদার প্রচার–প্রসার এবং ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে অনন্য খেদমত আঞ্জাম দেন।
উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ : ১. শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান: তিনি উপমহাদেশের ইসলামি জ্ঞানবিতরণে এক অনন্য নাম। অর্ধশতাধিক মাদ্রাসা, মসজিদ ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এশিয়ার শ্রেষ্ঠ ‘সাচ্চা আলেম’ তৈরির কারখানা জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসার (ষোলশহর, চট্টগ্রাম) পৃষ্ঠপোষক ছাড়াও তাঁর হাতে গড়া অন্যান্য শিক্ষাপীঠ: কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা (মুহাম্মদপুর, ঢাকা), তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা (হালিশহর, চট্টগ্রাম), তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা (চন্দ্রঘোনা, চট্টগ্রাম), মাদ্রাসা–এ তৈয়্যবিয়া (করাচি, পাকিস্তান), মাদ্রাসা–এ আহলে সুন্নাত (রেঙ্গুন, বার্মা)। ২. জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা) প্রবর্তন। ৩. খতমে গাউসিয়া ও অন্যান্য আমলে সংস্কার ও সংযোজন। ৪. সাংগঠনিক অবদান: সুন্নী মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রতিষ্ঠা করেন: গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ (১৯৮৬), মজলিশে গাউসিয়া সিরিকোটিয়া (পাকিস্তান), বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার পৃষ্ঠপোষকতা। ৫. প্রকাশনা: ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর মাসিক ‘তরজুমান–এ আহলে সুন্নাত’ প্রকাশের নির্দেশ দেন। ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি থেকে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু; যা আজও সুন্নিয়তের শীর্ষস্থানীয় ও প্রাচীনতম প্রকাশনা হিসেবে বিদ্যমান। তাঁর তত্ত্বাবধানে দরুদ শরীফের অনবদ্য আরবী গ্রন্থ ‘মাজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল’–এর উর্দু অনুবাদ সম্পন্ন হয়। ৬. ইসলামী আক্বীদা রক্ষা: নবী–অলীর মান–মর্যাদা সম্পর্কে সামান্যতম অসঙ্গতিপূর্ণ কথা শুনলে তিনি তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করতেন। আযানের পূর্বে সালাত ও সালাম পাঠ প্রচলন করেন এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সঠিক রূপরেখা জনগণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।
ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র : যুগের শ্রেষ্ঠ বিদ্বান, বাগ্মী, যুক্তিবিদ ও চিন্তাবিদ আল্লামা তৈয়্যব শাহ (রহ.) প্রত্যহ ফজর নামাজের পর বক্তব্য পেশ করতেন। দেশ–বিদেশের খ্যাতনামা আলিমগণ তাঁর মজলিসে ভিড় জমাতেন। তিনি ছিলেন দানশীল–অসংখ্য মাদ্রাসা ও দ্বীনি শিক্ষার্থীকে গোপনে আর্থিক সাহায্য করতেন। তাঁর মাঝে সর্বদা এক স্নিগ্ধ, শান্ত, মায়াবী ও নূরানী আভা বিরাজ করত। সান্নিধ্যপ্রাপ্ত সকলে বলতেন, “তিনি আমাকেই বেশি ভালোবাসতেন।” ইবাদত–রিয়াজতে অনন্য তিনি। সফরসঙ্গীরা গভীর নিদ্রায় থাকতেন, আর তিনি নিজ কক্ষে নামাজের জন্য দাঁড়িয়ে একাকী ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
যুগসংস্কারক হিসেবে স্বীকৃতি : আল্লামা তৈয়্যব শাহ (রহ.)-এর সংস্কারকর্ম, অবদান ও সফল প্রভাব বিবেচনায় তিনি একজন যুগসংস্কারক হিসেবে গণ্য। তাঁর প্রবর্তিত জশনে জুলুস, খতমে গাউসিয়া সংস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশনা–সবকিছুই ছিল সময়োপযোগী ও যুগের চাহিদার প্রতিফলন।
ইন্তেকাল : ১৯৯৩ সালের ৭ জুন, ১৪১৩ হিজরির ১৫ যিলহজ্ব সোমবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তাসবীহ পাঠকালে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর জানাযায় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গওহর আইয়ুবসহ দেশ–বিদেশের অসংখ্য আলিম–উলামা অংশগ্রহণ করেন। তাঁকে পিতার মাজারের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
উপসংহার : আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রকৃত অর্থেই যুগসংস্কারক, আক্বীদার রক্ষক, নবীপ্রেমের পথিকৃৎ ও ইসলামী শিক্ষার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল আল্লাহ ও রাসূলের বন্দনা, ধর্মানুভূতি জাগরণ এবং মুসলিম জাতিকে একাত্ম করার পথপ্রদর্শক। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মহান অবদান কবুল করুন এবং আমাদেরকে তাঁর দেখানো পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ












