ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখা শুরু সেই ১৯৯০ সাল থেকেই। সাদাকালো টিভির জমানায় তখনো আমাদের শহরে কোনো কোনো বাড়িতে বিদ্যুৎ লাইনের সরবরাহ থাকলেও কোনো কোনো বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ একদমই ছিলো না। আবার সবার ঘরে–ঘরে সেই সাদাকালো টিভি কেনার সামর্থ্য ছিলো না। যাদের ঘরে সাদাকালো টিভি ছিলো তখন ঐ ঘরে খেলা দেখা অনেককিছু। ঠেলাঠেলি করে কোনোরকমে খেলা দেখতে হতো। আহা! কি সময় পার করেছি। তখনতো প্রাইমারি গন্ডি সবেমাত্র পার করছি। আমাদের প্রাইমারি পাঠ্যপুস্তকে তখন পেলের ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তি কাহিনি পড়ে জেনেছি, এই কালো মানিকের ফুটবলে বিশ্বজয়ের রোমাঞ্চকর ইতিহাস। তখন বিশ্বমঞ্চে কোটি কোটি ফুটবল সমর্থকের মনে আরো একজন তোলপাড় করেছিলেন, তিনিই ফুটবল ইতিহাসের আরেক মহানায়ক দিয়াগো ম্যারাডোনা। তাঁর দেহের গড়ন যেমনই হোক না কেনো মাঠে ফুটবলের দেখা হলেই অনন্য শৈলীতে তিনি সেরা। পুরো মাঠ তিনি নানান কারিশমাট্যিকে দাপিয়ে বেড়াতেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিভির পর্দা থেকে তাঁর নজরকাড়া ফুটবল শৈলীতে চোখ সরানো মুশকিল! এমনিভাবে সেসময়কার ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে তাদের প্রিয়দলের প্রিয় খেলোয়াড়দের অসামান্য অবদান এখনো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের অনেকের কাছে সেদিনের কথা মনে করে নষ্টালজিকে হাসেন। যা এখনো অনেকের কাছে ব্যাপক সুখ্যাতির স্মৃতি হিসেবে ভুলতে পারেননি!
একসময় কালের অমোঘ টানে সেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপের জয়ের মহানায়ক দিয়াগো ম্যারোডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যে আবারো আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেলেন ১৯৯০ সালের ১৪ তম ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে। তখন আর্জেটিনা শিরোপা হাতের নাগালে পেয়েও বঞ্চিত হন রেফারির ইচ্ছাকৃতভাবে পক্ষপাতিত্বের সিদ্ধান্তের কারণে। সেসময় পশ্চিম জার্মানি (এখন দলটি জার্মানি নামে পরিচিত ) জিতে নেয় (১–০ গোলে) তাদের তৃতীয় ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বমঞ্চে এমন ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি আর্জেটিনাকে বিশ্বকাপ জিততে না দেয়ায় সেই বিতর্কের জন্ম এখনো অনেকে ভুলতে পেরেছে বলে মনে হয় না! অনেক ফুটবল প্রেমীতো সেসময় কয়েকদিন স্তব্ধ হয়ে নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। অনেকে তাদের জীবনও বিসর্জন দিয়েছেন। অগোচরে হু হু করে কেঁদেছে অনেকে। সেসময়কার কথা মনে পড়লে, এখনো সমর্থকদের মধ্যে বুকজুড়ে হুড়মুড় করে সেই কান্নার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। তবুও বিশ্বকাপের মহারণে এ তিক্ততার পাশাপাশি বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর মুহূর্ত দেখতে বাড়ির উঠোনে ছোটোবড়ো এবং বয়োজ্যেষ্ঠরা সবাই জড়ো হতাম। সবার মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা দেখতাম। যেদিন প্রিয়দলের খেলা সেদিন মন্দিরে অনেকে উপোস থেকে মানত করে পুজোও দিতো। যেন আজ প্রিয় দল জিতে যায়। অনেকে আবার টিভির পর্দায় টানা ফুটবল দেখতো না, কখন কি হয়ে যায়। সেটা মেনে নিতে কষ্ট হতো বলে! অনেকে নির্ধারিত এক পোশাকে কিংবা কেউ কেউ নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে নির্ধারিত আসনে চুপচাপ খেলা দেখতেন। কিন্তু নিয়মিত রং চা, মুড়ি, বিস্কুট, চানাচুর বেশ ফুরফুরে মেজাজ বহন করতো। যেন গোল বললেই, সবাই লাফ দিয়ে আকাশ ছুঁইতে চাইতো। এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ সত্যিই রোমাঞ্চকর। সেই সাথে ইতালির পেড্রোল পাম্পের বিজ্ঞাপন “পানি নিয়ে ভাবনা, আর না আর না, পেড্রোল পাম্প আছে আর কিসের ভাবনা” এখনো মনে আছে। কারণ এ বিজ্ঞাপনগুলো দেখতাম শুধুমাত্র বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন সময়ে। এদিকে খেলা উপভোগে কখনো বিজ্ঞাপন, কখনো রাত জেগে অনেক খাওয়াদাওয়া বাড়তি আনন্দের সুখস্মৃতি এনে দিতো। একেক জন একেকভাবে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন। তখন বিশ্বকাপে মাঠজুড়ে অনন্য অসাধারণ যত ড্রিবলিং দেখিয়ে সবার মন জয় করেছিলেন তাঁদের মধ্য অন্যতম ছিলেন এ ম্যারোডোনা। তবে এখনো আমরা ভুলতে পারিনাই আর্জেন্টিনার সেই রেশমি লম্বা চুলের ক্যানিজিয়া, বাতিস্তুতা, কখনো হুয়ান ভেরন, লোপেজের মতো ফুটবল তারকাদের। সেসময়কার ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, রোমারিও, বেবেতো, দুঙ্গা, রিভালদো, পশ্চিম জার্মানির অলিভার কান, লোথার ম্যাথিউজ, ক্লিন্সম্যান, মিরোস্লাভ ক্লোসা, ফ্রান্সের জিনেদিন জিদান, ইতালির রবার্তো ব্যাজিও, বুফেন, পাওলো মালদিনি, কলম্বিয়ার ঝাঁকড়া চুলের ভালদেরামা, ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহাম, মাইকেল ওয়েন রুনিদের মতো এমন অনেক তারকারা আছেন যাঁরা এ ফুটবল বিশ্বকাপকে তাদের অসাধারণ দক্ষতায় অনন্য উচ্চতায় মানুষের মনে এখনো ঠাঁই হয়ে আছেন।
তখন ভিউকার্ডের প্রচলন ছিলো তুঙ্গে। আমাদের মতো বয়সীদের পাশাপাশি বড়োরাও আশেপাশের দোকান থেকে এমন ফুটবল কিংবদন্তীদের ভিউকার্ড সংগ্রহ করতেন। অনেকেতো বছরের পর বছর তা সংরক্ষণে রেখে দিয়েছে। সেসময় আমরা বন্ধুদের সাথে আমার স্কুল নাসিরাবাদের বাইরে ফুটপাতে, কখনো জিইসির মোড়ে সেন্ট্রাল প্লাজা থেকে, কখনো জলসা সিনেনা হলের পাশের দোকান থেকে এ ভিউকার্ড সংগ্রহ করতাম। যত্ন করে এ্যালবামে রেখে দিতাম। আহা! কত সময় বয়ে গেলো! এখনও ভুলতে কষ্ট হয় সেই দিনগুলো। তখন প্রথমার্ধের বিরতিতে চানাচুর, মুড়ি, রং–চা কেউ আয়োজন করলে, কালকে আরেকজন করতো। কখনো আবার সবার চাঁদা তোলা তুলিতে এমন আয়োজন করা হতো। আমার কাকু ও দাদাদের মুখে খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি প্রিয় খেলোয়াড়ের স্তুতি শুনতে শুনতে সারারাত পার হয়ে যেতো। অনেকে ছোট পরিসরে নানান শ্লোগানে মুখরিত হয়ে মিছিল করেছে। পুকুরের মাঝখানে, গাছের মগডালে কিংবা পাড়ার উঁচু কোনো স্থানে প্রিয়দলের পতাকা লাগানো হতো। একসময় স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকার কুইজের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিলো। কেউ সারাবছর পত্রিকা না কিনলেও বিশ্বকাপ ফুটবল এলে একসাথে কয়েকটা কিনতো, কেউ নানান কৌশলে পত্রিকা সংগ্রহ করতো। পরে কার্টিং করে নির্দিষ্ট সময়ে পত্রিকা অফিসের কুইজ বুথে রেখে আসতো। পরদিন কুইজ ড্র–য়ের পুরস্কারও ছিলো উল্লেখযোগ্য।
একসময় পেলে, ম্যারাডোনা ও রোমারিওদের যুগ পার করে এখন আমরা সর্বকালের সেরা খেলোয়ার লিওনেল মেসিকে নিয়ে মাতোয়ারা সারা বিশ্ব। সেই সাথে সেই সেরার মঞ্চে আলো কেড়েছেন স্পেনের জাভি, ইনিয়েস্তা, আর্জেটিনার ডি–মারিয়া, ব্রাজিলের রোনালদিনহো, নেইমার, ক্রোশিয়ার লুকামদ্রিচ, মিসরের মোহাম্মদ সালাহ, ইংল্যান্ডের হ্যারি, পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যুগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখছি। এখনো তাঁদের অনেকেই আরো বেশী উন্মাদনা বয়ে নিয়ে কেউ কেউ এখনো বিশ্বকাপ ফুটবলে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। তাঁদের সাথে তরুণদের উপস্থিতি বেশ লক্ষনীয়। এ যেমন আর্জেটিনার হুলিয়ান আলভারেজ, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, লাউতারো মার্টিনেজ, রোমেরো, ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস, ফান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা স্পেনের ইয়ামালদের যুগে বিশ্বকাপ ফুটবলের উদযাপনের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যা এ শতাব্দীর মানুষের শুধু ঘরে ঘরে নয়, এখন প্রযুক্তির সর্বশেষ যুগে মানুষ যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো স্থান থেকে হাতের মুঠোফোনে খেলা উপভোগ করছেন। সেই সাথে একসাথে হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমী ফুটবল বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন জায়ান্ট স্ক্রিনে। এরপর প্রিয়দলের জয় শেষে মিছিল বের করা হচ্ছে। যা অলিগলি পেরিয়ে সড়ক, মহাসড়কে মহাধুমধামে। কথার লড়াইও যুক্তিতর্ক থেমে নেই। খেলা উপভোগে আপ্যায়নেও পরিবর্তন আসছে। যেমন বারবিকিউ হচ্ছে, কোথায় প্রিয়দলের নামে গাছের চারা বিতরণ করছে। কেউ কেউ একে অন্যকে প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা উপহার দিচ্ছে। রঙে রঙে রঙ্গিন হচ্ছে বাড়ির দেয়ালের রঙ। অনেকে দেওয়ালে দেওয়ালে প্রিয় খেলোয়াড়দের ছবি আঁকছেন। অলিগলির নামকরণও করছেন প্রিয় দলের নামে। আবার বিশ্বের কোথাও চিত্রশিল্পীরা ফেলে দেওয়া বোতলের ছিপি দিয়ে বানিয়েছেন প্রিয় তারকার মুখচ্ছবি। যা একদিকে যেমন নিজেদের মেধার বিকাশের পাশাপাশি সম্মানিত করা হচ্ছে প্রিয় খেলোয়ার কীর্তির প্রতি। সত্যিকারার্থে প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে সারাবিশ্বে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্য এমন উদযাপন মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। গোটাবিশ্ব জানতে পারছে কয়েক সেকেন্ডে। তাই সাদাকালো টিভির যুগ বদলে রঙিন টিভি এসেছে। এরপর হাতেহাতে অ্যানরয়েড প্রযুক্তি পৌঁছাতেই জায়ান্ট স্ক্রিনে খেলা দেখার খবরে ব্যাপকভাবে বিশ্বকাপ উদযাপনে জড়ো হচ্ছেন নিমিষেই। কোথাও ঢাকঢোল মেতেছে, কোথাও হোলির মতো রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে। কখনো কখনো বড়বড় শহর কখনোবা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হলের মাঠেও জায়েন্ট স্ক্রিনে উপচে পড়া উন্মাদনার ঢেউ আঁচড়ে পড়েছে। এছাড়াও দেশে–বিদেশে সরকারি বেসরকারি টেলিভিশনেও ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিদিনের খেলার হারজিতের প্রেডিকশান নিয়ে তারকারা তাদের মতামত জানাচ্ছেন। টকশোতে চলছে খেলাকে ঘিরে বিশদ বিশ্লেষণ। জার্সি কেনার ধুম আগের তুলনায় এখন আকাশচুম্বী। কেউ কেউ অগ্রিম পরিশোধ করেও প্রিয়দলের জার্সি পাচ্ছেন না। তাই সময়ের সাথে প্রযুক্তি বদলের যুগে বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনার ধরণ বদল হবেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে দুঃসংবাদ মন খারাপ করে দেয়। তাই জীবন বিপন্ন হবে কিংবা কখনো কখনো তা মরা ঘাসের রঙের মতো ফিকে হয়ে যাবে, এমন উদযাপন থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ অনাকাঙ্ক্িষত কোনো ঘটনায় কিন্তু একটি দুর্লভ জীবন কিংবা একটি পরিবারের স্বপ্ন নিমিষেই নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই সতর্ক থেকে যেকোনো উদযাপন করা শ্রেয়।











