জীবন কখনো কবিতার মতো সুন্দর, কখনো বেদনার ভারে জড়িয়ে এক অচেনা অস্তিত্বে পরিণত হয়। যেন বিপরীতমুখী দুই রাজনৈতিক দর্শন– পাশাপাশি থেকেও কখনো এক হয় না। আগুন ও বরফের পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, অথচ মানুষের ভেতরে নেমে আসে এক গম্ভীর নীরবতা, পলকহীন দৃষ্টি এবং শূন্যতার দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। ঠিক সেই মুহূর্তেই অদৃশ্য আলোড়ন জেগে ওঠে অন্তরে। মানুষ নিজের অজান্তেই কলম হাতে নেয়। জন্ম নেয় কবিতা।
অনেকেই মনে করেন কবিতা রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো– রাজনীতি বলতে আমরা কী বুঝি? যদি রাজনীতি কেবল দলীয় ক্ষমতার হিসাব না হয়ে মানুষের ন্যায়, স্বাধীনতা, বৈষম্য ও মানব মর্যাদার প্রশ্ন হয়, তবে কোনো কবিই তার বাইরে নন। প্রতিটি কবির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে একটি নীতি, একটি নৈতিক অবস্থান এবং সমাজকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। সুতরাং কোনো কবি যদি বলেন –আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই, তবে সেটি অনেক সময় সরাসরি দলীয় পরিচয় থেকে দূরে থাকার ঘোষণা হতে পারে; কিন্তু নীতি ও সামাজিক অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকার দাবি নয়। কারণ নান্দনিকভাবে এড়িয়ে গেলেও শিল্প শেষ পর্যন্ত মানুষের পক্ষেই কথা বলে। রামায়ণ, মহাভারত কিংবা হোমারের ইলিয়াড– সব মহাকাব্যেই ক্ষমতা, রাষ্ট্র, যুদ্ধ ও মানবিক ন্যায়বোধের গভীর রাজনৈতিক অভিঘাত রয়েছে। গোর্কি, মায়াকোভস্কি, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, সমর সেন ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়– তাঁদের কবিতাও সমাজবাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁদের শিল্প মানবজীবনের সংগ্রামকে ভাষা দিয়েছে।
ইতিহাসে এমন কবিও আছেন– যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। রোমুলো গায়েগোস ছিলেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট; লেওপোল্ড সেদার সেংহর ছিলেন সেনেগালের প্রেসিডেন্ট। আর পাবলো নেরুদা– যার প্রকৃত নাম রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেয়েস বাসোয়ালতো– ছিলেন কবি, কূটনীতিক, সেনেটর এবং মানবমুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত এক মানবতাবাদী কণ্ঠ। আমাদের দেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে বহু কবি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক চেতনায় বিশ্বাসী হলেও প্রকাশ্যে দলীয় সম্পৃক্ততা স্বীকার করতে দ্বিধা করেন। কারণ মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে শিল্পীকে প্রায়ই অযাচিত সমালোচনা ও বিভাজনের মুখোমুখি হতে হয়। তবু সত্য একটাই– কবিতা কখনো ক্ষমতার মুখপাত্র নয়; কবিতা মানুষের বিবেক।












