আঁরার কচুর ছরা খাইলে বুঝিবা ন খাইলে পস্তাইবা

রশীদ এনাম | সোমবার , ৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ

কচু নিয়ে সুকুমার বড়ুয়ার মজার একটি আঞ্চলিক ছড়া আছে, “মা ন জানে কচুহাক কুইটত/ ঝিএ চায় যে লবণী রাঁইনত/কানাই মাদারী বাকখালী/কত দেশত পাকখালী/কর্তালা যাই কচু হাক ইলিশ মাছর নাক খালি/বোয়ালখালি কাতালগঞ্জ/কত দুয়ার ধাক্কালী/বড় মাছর মাথা ন পাই/তেলা কচুর হাক খালি”

চাটগাঁইয়া আঞ্চলিক প্রবাদ আছে, ঝগড়ার আগে কচু খাও। গলা চুলকালে নাকি বেশি করে ঝগড়া করা যায়। ঝগড়া করলে বলে বেশি কচু খেয়েছে। গলা চুলকাইতেছে তাই গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করছে। যে যাই বলুক ভাই পটিয়ার মানুষ কিন্তু শান্তপ্রিয়। ঝগড়ার মধ্যে নেই। পটিয়ার মাটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের রসে যেমন ভরা ঠিক কচু চাষের জন্য উর্বর। কোনো এক পল্লিকবি চট্টগ্রাম পরিদর্শনে এসে বলেছিলেন, “আসল সৈয়দ যারা মাইল্ল্যা পাড়া হারালাতে ফকির বেশ। পটিয়াতে কচুর ছরা চরকানাইতে ভোয়াইয়া বেশ।”

ছোটবেলা থেকে জেনেছি পটিয়া কচুর জন্য বিখ্যাত। পার্শ্ববর্তী উপজেলার মানুষ রসিকতা করে বলে, “ওবা তোঁরা ত পইট্টইয়া কচু”। ‘কচুয়াই’ নামে পটিয়াই একটা গ্রামও আছে। পটিয়ার বিখ্যাত কচুর চারা সমগ্র দেশের কাঁচা বাজারে যায়। পটিয়া সদর থেকে শ্রীমতী খালের ব্রিজ পার হলে চোখে পড়বে কচু খেত বা কচুর বাগান। শ্রীমতী খালের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বালির রাজ্যে কচুর চারার চাষ হয়। কচুর চারা পাহাড়ি এলাকায় বলে গুরা কচু, কেউ বলে মুখী কচু, কেউ বলে কুড়ি কচু, কোনো কোনো জায়গায় দুলি কচু, বন্নি কচু নামেও পরিচিত।

শ্রীমতি খালের ধারে শুকনো মৌসুমে কৃষকরা কচুর চাষ করে থাকে। কচু গাছ এক থেকে দুই হাত লম্বা হয়ে থাকে। গাছ পরিপক্ক হলে গাছের চারা উৎপাটন করে গাছের মূল থেকে ছড়া, কচু সংগ্রহ করা হয়। অনেকে আবার কচুর লতি বা কচুর ফুলের জন্য গাছ উৎপাটন না করে রেখে দেয়। কচুর ফুল বা ফোঁপা, লতি বেশ সুস্বাদু। পটিয়ার অনেক জায়গায় আবার পানি কচুর চাষও হয়। পান্য কচু বা পানি কচুকে জল খাসি বলে থাকে। কচুর জন্য বিখ্যাত পটিয়া।

বাংলাদেশে পটিয়ার মতো আর কোনো জায়গায় এত কচুর চাষাবাদ হয় না। পটিয়ার কচু অনেকে প্রবাসীদের জন্য পর্যন্ত পাঠিয়ে থাকে। কচুর ছড়া গরুর হাড় মাংস দিয়ে রান্না করলে খেতে বেশ সুস্বাদুু। কচুর ছড়া বেশ সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। এতে প্রচুর পরিমাণ শ্বেতসার, ক্যালসিয়াম, লৌহ, ফসফরাস এবং ভিটামিন এ ও সি আছে। কচুর ছড়া অম্ল পেট শুলেও হজম ক্ষমতা বেশি উপকারি। তাছাড়া কচুর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে লৌহ যা শরীরের জিংকের ঘাটতি পূরণ করে।

১৯৯৭ সালের কথা পটিয়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এসেছিলেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। স্যার জিজ্ঞাস করেন পটিয়া কিসের জন্য বিখ্যাত ? স্যারকে বললাম, স্যার কচুর জন্য। স্যার মিটিমিটি হেসে বললেন, শুনে অনেকের গলা চুলকানি শুরু হয়ে গেছে। ঠিক আছে পরবর্তী সময়ে পটিয়া আসলে রশীদ এনামের বাসায় কচুর রান্না খাব। পটিয়ার কচুর স্বাদ নিব না তা কি হয়”।

পটিয়া কচুর ছড়ার রাজ্য শ্রীমতি খালের দুই পাশ। কচুর ছড়ার চাষাবাদ দেখতে শ্রীমতী খালের পাড়ে কচু ক্ষেত দেখতে গেলাম। কচুর চাষ অনেকটা বিলুপ্তের পথে। আগের মতো এখন কচু ছড়া চাষাবাদ হয় না। দিন দিন কৃষকের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। কচুচাষি কামাল ও পরিমল জানান, কচু চাষের জন্য বালি/পলিমাটি বেশ ভালো। বালিমাটিতে কচুর চাষ ভালো হয়। অতিরিক্ত বালি উত্তোলনের ফলে শ্রীমতি খাল এলাকায় জমির পরিমাণও দিনদিন কমে যাচ্ছে। শ্রীমতি খালের পাড়ে কচুর চাষ আগের মতো হয় না। সরকারিভাবে যদি কচু চাষের জন্য স্বল্পহারে কৃষিঋণ পাওয়া যায় কিংবা কচুচাষে যদি কৃষিবিভাগ থেকে কচুচাষের জন্য প্রণোদনা পাওয়া যায় অনেকে কচু চাষে আগ্রহী হবে”। মাঠে গিয়ে দেখলাম পুরো মাঠ যেন কচুর রাজ্য। সবুজ পাতা গাছের পাতার ওপর জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো জমে আছে। একটু নাড়া দেয়াতে পাতার উপর থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে টুপটাপ করে। কচু চাষিরা কচু গাছের মূল থেকে কচুর ছড়া সংগ্রহ করতে ব্যস্ত। কাদা যুক্ত কচুর চারা সংগ্রহ করে টুকরিতে নিচেচ্ছ। কেউ কেউ কচুর চারা সংগ্রহ করে শ্রীমতি খালের পানিতে নিয়ে পরিষ্কার করে হাটবাজারে নিয়ে যাবে। একসময় পটিয়া কচুয়াই ইউনিয়ন এবং হাঁইদগাঁও এলাকার অনেকে কচু চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছে। প্রতি কেজি কচুর ছড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা।

কি অদ্ভুত কচু গাছের চারা। উপরে তার সবুজ পাতা। মাটির নিচে কচু গাছের মূলের সাথে কচুর চারার জন্ম। কচুর চারা মাটির নিচ থেকে তুলতে গিয়ে কচু গাছের মৃত্যু হয়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কবিতায় কচুর প্রসঙ্গ আছে, “গোলাপ রাঙিয়া উঠি করিল জবাব/গন্ধে ও শোভায় বনে আমারি প্রভাব/কচু কহে গন্ধ শোভা নিয়ে খাও ধুয়ে/ হেথা আমি অধিকার গাড়িয়াছি ভুঁয়ে/মাটির ভিতরে তার দখল প্রচুর/প্রত্যক্ষ প্রমাণে জিত হইল কচুর”।

পটিয়ার কচুর ছড়া এক সময় বাংলাদেশের সমগ্র জেলায় পৌঁছে যেত। বাণিজ্যিকভাবে কচুর চাষাবাদে কৃষকরা যদি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পান কচু চাষে অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভবান হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধআমরা কি ব্যবহারকারীই থাকব, নাকি নির্মাতাও হব?