জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ৩ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ বিবরণী দাখিল করার অভিযোগে পটিয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম–১ এর উপ–সহকারী পরিচালক মো. সবুজ হোসেন বাদী হয়ে নিজ কার্যালয়ে এই মামলা দুটি দায়ের করেন। নির্ধারিত সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর নিজ নামে এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গের নামে অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ চেয়ে দুদক থেকে আইন অনুযায়ী সম্পদ বিবরণী ফরম জারির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তার বরাবর সম্পদ বিবরণী ফরম জারি করা হয় এবং তা যথাযথভাবে পূরণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কমিশনে জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
তবে ডা. তিমির বরণ চৌধুরী দুদক কার্যালয় থেকে ফরম গ্রহণ করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা পূরণ করে দুদকে দাখিল করেননি। এমনকি এ বিষয়ে কোনো সময় বৃদ্ধির আবেদনও করা হয়নি। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে সম্পদ বিবরণী ফরম দাখিল না করা এবং নোটিশ অমান্য করা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, অনুসন্ধানে ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৩ টাকা মূল্যের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি পটিয়ার কেলিশহর এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে নগরীর রহমতগঞ্জ এলাকায় বসবাস করছেন। তিনি ২০১৯ সাল থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি মেসার্স এস. এ. এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার এবং সেবা হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড, চট্টগ্রামের একজন পরিচালক। তার স্ত্রী শিল্পী সেনগুপ্ত শাহী কমার্শিয়াল কলেজের একজন প্রভাষক। দুদকের অনুসন্ধানে প্রকাশ পায় যে, আসামি ডা. তিমির বরণ চৌধুরী পটিয়ার কেলিশহর এবং কোতোয়ালী থানাধীন রহমতগঞ্জ এলাকায় পৈত্রিক ও অন্যান্য সূত্রে প্রাপ্ত জমিতে যৌথভাবে একটি ১০ তলা আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেন। চুক্তিপত্র ও আমমোক্তারনামা অনুযায়ী উক্ত ভবন নির্মাণে তিমির বরণ চৌধুরী মোট ৫৩.৩৩ শতাংশ বিনিয়োগ ব্যয় বহন করেন। ২০১৭–১৮ করবর্ষ থেকে ২০২৩ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর রিটার্নে তিনি ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ প্রদর্শন করলেও, প্রকৌশলীর পরিমাপ প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি উক্ত ভবনে ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছেন, যা তার স্থাবর সম্পদ হিসেবে অর্জিত হয়েছে। এছাড়া অনুসন্ধানে তার বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, বেসিক ল্যাব ও সেবা হাসপাতালে বিনিয়োগ, শেয়ার ক্রয়, আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও হাতে নগদ অর্থ মিলিয়ে মোট ১৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এজাহারে বলা হয়, ডা. তিমির বরণ চৌধুরীর মেয়ের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের শিক্ষা ব্যয়সহ অন্যান্য পারিবারিক খরচ বাবদ প্রায় ৫৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে তার সর্বমোট অর্জিত সম্পদ ও ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮৩ টাকা। বিপরীতে অতীত সঞ্চয়, ঠিকাদারি ব্যবসা, গৃহ সম্পত্তির ভাড়া, জনপ্রতিনিধি হিসেবে সম্মানি ভাতা, কৃষি ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে তার মোট গ্রহণযোগ্য আয়ের উৎস পাওয়া গেছে ১ কোটি ৯৪ লাখ ৪২ হাজার ৭৯০ টাকা। গ্রহণযোগ্য আয় বাদ দিয়ে তার মোট ৩ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৩ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ও অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এই অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগ দখলে রেখেছেন তিনি। যা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম–১ এর উপ–পরিচালক আল আমিন দৈনিক আজাদীকে মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।












