পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) উপলক্ষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আয়োজিত জশনে জুলুসে সভাপতির বক্তব্যে আওলাদে রাসুল পীরে বাঙাল আল্লামা সৈয়দ মুহম্মদ সাবির শাহ বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনে আনন্দ প্রকাশের অংশ হিসেবেই জশনে জুলুস বের করা হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া মহান নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হয়।
তিনি বলেন, হিজরতের সময় মদিনার উপকণ্ঠে মহানবী সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বাগত জানাতে মদিনাবাসী আনন্দ–উচ্ছা্বাসের সঙ্গে ‘তালা’ আল বদরু ‘আলাইনা’ কাসিদা পাঠ করেছিলেন। সেই মদিনার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনুসরণেই জশনে জুলুস উদযাপন করা হচ্ছে। এখানে শরিয়তবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই। তেলাওয়াত, না’ত ও কোরআন–সুন্নাহর আলোচনা এবং আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের মধ্য দিয়েই এসব আয়োজন সম্পন্ন হয়। গত ২৬ আগস্ট ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ঐতিহাসিক জশনে জুলুসের। ৫৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে হয়ে আসা এ ধর্মীয় শোভাযাত্রায় লক্ষ লক্ষ নবীপ্রেমিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান অংশ নেন। ১৯৭৪ সালে হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (র) প্রবর্তিত এ জশনে জুলুস এখন বাংলাদেশের অন্যতম ধর্মীয় সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে।
আন্জুমান–এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট এ জশনে জুলুসের আয়োজন করে। জশনে জুলুসে নেতৃত্ব দেন আওলাদে রাসূল পীর হযরত আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ (মাজিআ)। জুলুসে প্রধান অতিথি ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়দ মুহাম্মদ কাসেম শাহ (মাজিআ)। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাহেবজাদা সৈয়দ আকিব আহমদ শাহ (মাজিআ)। অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম–৮ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ্।
জুলুসে পীর আল্লামা সাবির শাহ বলেন, মহানবী সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের শুভাগমন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তাই তাঁর জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করা মূলত আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায়েরই বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, মহানবী সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দুনিয়ায় শুভাগমনের সময় আরব সমাজে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিরাজ করছিল। মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল বিপর্যস্ত। নারীর প্রতি চরম অবমাননা, দুর্বলদের ওপর নির্যাতন এবং নানা ধরনের সামাজিক অনাচার ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা। এমন এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মহানবীর আগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে আলোর সূচনা করে।
জশনে জুলুসের ঐতিহ্য তুলে ধরে পীর সাবির শাহ বলেন, এ জুলুসে কোরআন তিলাওয়াত, না’ত, দরুদ–সালাম এবং ক্বোরআন–সুন্নাহভিত্তিক আলোচনা এ আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এর মধ্য দিয়ে মহানবীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাও হয়। তিনি বলেন, মহানবী সল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের জীবন মানবতার জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ন্যায়, সহমর্মিতা, সৌহার্দ্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
জশনে জুলুসকে ঘিরে ১২ রবিউল সকাল থেকেই নগরীর অলি–গলি মুখর হয়ে ওঠে। চারদিকে কোরআন তেলাওয়াত, না’তে রসুল (দ.) পাঠ, নারায়ে তাকবির–আল্লাহু আকবার, নারায়ে রেসালাত–ইয়া রাসুলাল্লাহ (দ) স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা। জুলুস সকাল ১০টায় ষোলশহরস্থ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে মুরাদপুর, ২নং গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগার পাস হয়ে আবার একই পথে মাদ্রাসা প্রাঙ্গনে এসে শেষ হয়।
মাহফিলে সাহেবজাদা সৈয়দ আকিব আহমদ শাহ বলেন, মহানবীর আগমন উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর আদর্শকে বাস্তব জীবনে ধারণ করাই হওয়া উচিত মিলাদুন্নবী উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য। রবিউল আউয়ালের জুলুসের উদ্দেশ্য উম্মাহর ঐক্য প্রকাশ করা। তিনি বলেন, রবিউল আউয়ালে আয়োজিত জুলুসের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আমি আপনাদের বলতে চাই, রবিউল আউয়ালের জুলুসের মূল উদ্দেশ্য হলো–বিশ্বের কাছে এই বার্তা তুলে ধরা যে, সমগ্র মুসলিম উম্মাহ মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছাড়া এমন আর কেউ নেই, যাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে কোটি কোটি মানুষ একত্রিত হয়। আমরা আমাদের প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস অনুসরণ করি– ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’
আন্জুমান ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল আনোয়ার হোসেন জুলুসে অংশগ্রহণকারী, পুলিশ, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ৫৫ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এ জুলুস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ৫০ লাখেরও বেশি মানুষের এতে অংশগ্রহণ আছে। তাই, এ জুলুসকে গিনেস বুকে স্বীকৃতি দেয়া এখন সময়ের দাবি। তিনি সরকারিভাবেও এ জুলুসকে ঈদে মিলাদুন্নবীর কর্মসূচি হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করার দাবি জানান।
আন্জুমান ট্রাস্টের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মনজুর আলম মনজু বলেন, জশনে জুলুস বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় শোভাযাত্রা। রাসুল প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সুন্নী মুসলমানরা এ জুলুসে অংশ নেন। চট্টগ্রামের অলি গলি, দূর–দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী অহিংসা, মানবিকতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হয়। এ জুলুস সফল করার ক্ষেত্রে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন গাউসিয়া কমিটির কর্মীবাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক, আন্জুমান ফোর্স প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সহ সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন আনজুমান ট্রাস্টের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি ও জুলুস কনভেনার মোহাম্মদ সামশুদ্দীন, অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস এম গিয়াস উদ্দীন (সাকের), ফাইন্যান্স সেক্রেটারি মোহাম্মদ কমর উদ্দীন (সবুর), প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন সেক্রেটারি মোহাম্মদ গোলাম মহিউদ্দীন, ক্যাবিনেট মেম্বার পেয়ার মোহাম্মদ, মোহাম্মদ হোসাইন খোকন, মাহমুদ নেওয়াজ, জামেয়ার চেয়ারম্যান প্রফেসর আবুল মহসিন মো. ইয়াহিয়া খান, শায়খুল হাদীস হাফেজ সোলায়মান আনসারী, আনজুমান সদস্য শাহাজাদ ইবনে দিদার, আনোয়ারুল হক, তৈয়বুর রহমান, আবদুল হামিদ, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ নুরুল আমিন, নূর মোহাম্মদ কন্ট্রাক্টর, এস শরফুদ্দীন মোহাম্মদ শওকত আলী খান (শাহীন), আবদুল হাই মাসুম, প্রফেসর জসিম উদ্দীন, সাদেক হোসেন পাপ্পু, মাহবুবুল আলম, জসিম উদ্দীন, মাহবুব ছফা, আশফাক আহমেদ, ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম, ফরিদুল আলম, তৌহিদুল করিম, আর ইউ চৌধুরী শাহীন, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, হাফেজ মারুফুর রহমান, মুখপাত্র অ্যাড. মোছাহেব উদ্দীন বখতিয়ার, আনজুমান এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সচিব প্রফেসর আবু ছালেহ মো. নঈম উদ্দীনসহ বোর্ডের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ, আনজুমান রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, জামেয়াসহ আনজুমানের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং হাজারো ধর্মপরায়ণ মুসল্লিবৃন্দ।
জুলুস ময়দানে মাহফিলে বক্তব্য দেন, অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান আলকাদেরী, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ কাজী আবদুল আলীম রিজভী, মুফতি কাজী আবদুল ওয়াজেদ, আনজুমান এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নূ ক ম আকবর হোসেন, ঢাকা কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা জসিম উদ্দীন আযহারী, উপাধ্যক্ষ মুফতি আবুল কাশেম ফজলুল হক, মাদ্রাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভী, জামেয়ার আরবি প্রভাষক মাওলানা মুহাম্মদ জয়নুল আবেদীন কাদেরী, ইংরেজি প্রভাষক মুহাম্মদ আহসান হাবীব, সহকারী মৌলভী মুহাম্মদ শাওয়াল হোসেন। সঞ্চালনা করেন আনজুমান রিসার্চ সেন্টারের গবেষক মাওলানা মুহাম্মদ আবুল হাশেম কাদেরী।
মাহফিল শেষে যোহরের নামাজ আদায়ের পর সিলসিলাহ্র কার্যক্রম, মিলাদ–ক্বিয়ামের পর বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ্র শান্তি কামনায় মোনাজাত করেন আল্লামা পীর সাবির শাহ্ (মাজিআ)।









