ফটিকছড়িতে পুলিশের সঙ্গে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের গুলিবিনিময়ের পর বড় সাজ্জাদ বাহিনীর অন্যতম সহযোগী ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি, সাজ্জাদ বাহিনীর প্রধান শ্যুটার হিসেবে চিহ্নিত মোবারক হোসেন ওরফে ‘কালা মোবারক’ ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’সহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৩ রাউন্ড গুলি, তিনটি ম্যাগজিন এবং বেশ কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পুলিশের অভিযানের সময় একটি বাড়ির ফলস ছাদে লুকিয়ে ওখান থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিল মোবারক। কোতোয়ালী থানা থেকে লুট করা পুলিশের অস্ত্র দিয়েই তিনি পুলিশের দিকে গুলি ছুঁড়ছিলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন।
গত বুধবার ভোররাতে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর পল্লানপাড়া এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, গোপন খবরের ভিত্তিতে শাহনগর এলাকার ওয়াজ পাল্লানের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। ওই সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অস্ত্রধারীরা গুলি ছুঁড়ে। আত্মরক্ষার্থে এবং সরকারি অস্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। অভিযানকালে গলাকাটা মোবারক বাড়ির ফলস ছাদে ঢুকে পড়ে এবং ওখান থেকে গুলি করতে থাকে। সন্ত্রাসীদের গুলিতে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। আহত অন্যরা হলেন ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আলম খান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দেহরক্ষী কনস্টেবল মামুনুর রশিদ এবং ফটিকছড়ি থানার কনস্টেবল শাহ নেওয়াজ ও সাদ্দাম হোসেন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গলাকাটা মোবারক লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকায় পূর্বপরিচিত ওয়াজ পাল্লানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছেন এমন খবর নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার রাত ৩টার দিকে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলে। বাড়ির প্রবেশপথের মূল গেটটি লোহার। কিন্তু পুলিশ অনেক ডাকাডাকি এবং দরজা পিটালেও ভিতর থেকে কেউ দরজা খোলেনি। এক পর্যায়ে পুলিশ দেয়াল টপকে বাড়ির ছাদে অবস্থান নেয়। পরে স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে লোহার দরজা ভেঙে ভোর সাড়ে ৪টা নাগাদ পুলিশ বাড়িতে প্রবেশ করে। পুলিশ সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে প্রথমে ওয়াশরুমের ওপরে থাকা ফলস ছাদে মোবারকের সহযোগী রায়হানকে দেখতে পান। তাকে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে একইভাবে ফলস ছাদের ভেতর থেকে নাছির ও ফরিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘরের ভিতরে একটি কক্ষের ওয়াশরুমের ফলস ছাদের ওপর মোবারক লুকিয়ে থাকে।
পুলিশ ওই কক্ষে প্রবেশ করতেই মোবারক তার হাতে থাকা ব্রাজিলের তৈরি তরাস পিস্তল দিয়ে গুলি ছুঁড়তে শুরু করেন। পুলিশ দ্রুত নিরাপদ অবস্থান নেয় এবং পাল্টা গুলি চালায়। মোবারক একের পর এক ছয় রাউন্ড গুলি করেন। ওই সময় পুলিশ সাত রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে। সপ্তম গুলি ছোঁড়ার সময় মোবারকের পিস্তলে গুলি আটকে যায়। একপর্যায়ে ঘটনাস্থল থেকে কুখ্যাত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের সেকেন্ড ইন কমান্ড এবং বাহিনীর প্রধান শ্যুটার গলাকাটা মোবারককে ফলস ছাদ থেকে নামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। গলাকাটা মোবারক ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার মনিকপুরের হাছি চৌধুরী বাড়ির লোকমানের পুত্র। তার সাথে গ্রেপ্তারকৃত অপর তিনজন হলেন, লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর এলাকার পাল্লান পাড়ার ওয়াজ পাল্লানের বাড়ির বদিউল আলমের পুত্র মোহাম্মদ রাইহান ওরফে রায়হান (৪০), একই বাড়ির মৃত আমির হোসেনের পুত্র মো. ফরিদ (৫০) ও মৃত শমসু সওদাগরের পুত্র মো. নাছির (৫২)।
সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃত মোবারক হোসেন ওরফে কালা মোবারক বড় সাজ্জাদ বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অস্ত্র ব্যবহারে তার দক্ষতা তাকে বাহিনীর প্রধান শ্যুটার বানিয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ফটিকছড়ির জামাল ও সাদ্দাম হত্যা, রাউজানের মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যা এবং নগরের সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা রয়েছে।
বিশেষ করে গত ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী চৌমুহনী এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে হত্যার ঘটনায় কালা মোবারকের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছে পুলিশ। ওই দিন দুপুরে পাহাড়তলী এলাকায় মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ওই হত্যা মামলার তদন্তে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কালা মোবারককে শনাক্ত করা হয়। তাকে ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে শনাক্ত করার পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের একটি উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিযানে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের তৈরি একটি ৯ এমএম তরাস পিস্তল, ইতালির তৈরি একটি ৭ দশমিক ৬৫ এমএম পিস্তল, পাকিস্তানের তৈরি একটি রিভলবার এবং একটি দেশীয় পিস্তল। এ ছাড়া ৯ এমএম পিস্তলের ১৮ রাউন্ড গুলি, ৭ দশমিক ৬৫ এমএম পিস্তলের পাঁচ রাউন্ড গুলি, তিনটি পিস্তলের ম্যাগজিন, তিনটি পিস্তলের গুলির খোসা এবং চারটি শটগানের গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া ব্রাজিলের তৈরি ৯ এমএম পিস্তলটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার লুট হওয়া সরকারি অস্ত্র। ৫ আগস্ট থানা লুটের সময় অস্ত্রটি লুট করা হয়েছিল। এই অস্ত্রটি দিয়ে গ্রেপ্তারের আগে কালা মোবারক পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, বড় সাজ্জাদ বাহিনীর সঙ্গে কালা মোবারকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বাহিনীর বিভিন্ন খুন ও চাঁদাবাজির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের অপরাধজগতে বড় সাজ্জাদ বাহিনী সামপ্রতিক সময়ে বেশ কিছু অঘটন ঘটিয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ডেভিড ইমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। গতমাসে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে মোবারকসহ অন্যদের ব্যাপারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওসব তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সাজ্জাদ বাহিনীর সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশ তথ্য পেয়েছে যে, গলাকাটা মোবারক ফটিকছড়ি এবং রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপদ আস্তানা গড়ে ওখানে বসবাস করেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার ভোরে ফটিকছড়িতে অভিযান পরিচালনা করা হয় বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, চট্টগ্রাম জেলার আইনশৃক্সখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধী যতই শক্তিশালী বা দুর্ধর্ষ হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনার জন্য জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে মোবারক গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ফটিকছড়ি, রাউজান ও চট্টগ্রাম নগরে স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পুলিশের তথ্যমতে, চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৪ মে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের ব্যবসায়ী মো. আবছার উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে সহযোগীদের নিয়ে গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে মোবারকের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে এলাকা ছেড়ে ছিলেন ব্যবসায়ী আবছার।
মোবারকের ভয়ে এলাকার মানুষ আতঙ্কে থাকতেন। তাকে গ্রেপ্তারের খবর স্বস্তির। তিনি যেন আর বেরিয়ে এসে এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে না পারেন, সেটিই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।







