‘এই নাও তোমার পুতুল। খেলনাপাতি। এখানে বসে ইচ্ছেমত খেলা করো। দৌড়াদৌড়ি করবে না। আমাকে বিরক্ত করবে না। কোনো রকম চেঁচামেচিও চাই না।’ শাসন–সুরে কথাগুলো বললেন মা। বলেই তড়িঘড়ি ছুটে যান ড্রইংরুমে। যাওয়ার সময় জামিলাকে ডেকে কাজের খোঁজ নেন। কাজ মানে রান্না–বান্না। কী কী করছে কিংবা কী কী করতে হবে তার ফাই–ফরমায়েশ। বললেন, ড্রইংরুমে এক কাপ চা দিয়ে যেও।
ড্রইংরুমে ঢুকেই ফ্যানটা ছেড়ে অন করেন টিভি। বোশেখ মাস। প্রচুর গরম পড়ছে। ঘাম ঝরছে ঘরে–বাইরে। কাঠফাটা রোদ্দুরে মানুষের প্রাণান্ত অবস্থা।
সোফায় মিসেস আলিয়া গা’টা এলিয়ে বসে পড়েন। রিমোর্ট হাতে–ই ছিল। চ্যানেলের পর চ্যানেল ঘুরিয়ে কাঙ্ক্ষিত চ্যানেলে যেতে হয় না। একবারেই ডাবল সাত চেপে সিরিয়ালে পৌঁছে যায়। বহুদিন ধরে দেখতে দেখতে সিরিয়ালে আসক্ত হয়ে পড়েন। এমন আসক্তি আলিয়ার, সিরিয়ালে বুঁদ হতে না পারলে পেটের ভাত যেন হজম হতে চায় না। টুকির বাবা প্রাইভেট একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ৯–৬ টা অফিস। কাজের কোন ঠিক–ঠিকানা নেই। সময়েরও সীমানা নেই। কখনও সন্ধ্যা রাতে, কখনও গভীর রাতে বাড়ি ফেরেন। যেদিন সন্ধ্যারাতে ফেরেন– আসার সময় এক গাদা খেলনাপাতি নিয়ে আসেন। ঘরে ঢুকেই ডাক পাড়েন– টুকি মা, মা টুকি– তুমি কোথায়? এদিকে এসো, এই দেখো তোমার জন্য কী এনেছি। বাবার আদুরে কণ্ঠ শুনে টুকি দৌড়ে ছুটে যায় পড়ার টেবিল রেখে। বাবা চুমু আর খেলনাপাতি দিয়ে আদর করেন। এটুক আদরই বাবার কাছ থেকে সে পায়।
সেদিন মায়ের শাসানো স্বরে তটস্থ টুকি একমনে খেলছিল। পুতুলকে বুকে জড়িয়ে, চুমু দিয়ে, কখনও পোশাক পরিয়ে, কখনও মাথা আঁচড়িয়ে। চাবি দেয়া গাড়িতে চড়িয়ে কখনও পুতুলটাকে মামার বাড়িতে বেড়াতে পাঠায়। কিন্তু টুকি বেড়াতে পারে না, ঘরের গণ্ডি ছেড়ে বাইরে যেতে পারে না সে। বিরাট একটি খাঁচায় সে বন্দী। ইট–পাথরের খাঁচায় বন্দী থেকে একা একা আর কত খেলা যায়? একঘেয়ে লাগে। স্বাধীনতা বা মুক্তির স্বাদ সে যেন নিতেই পারছে না। খেলতে খেলতে হঠাৎ তার মনে এক টুকরো মেঘ এসে জমে যায়। কান্নার ভাব আসে। চোখ ছল ছল করে। সে মায়ের কাছে যেতে চায়। কিন্তু ভয়ে যেতে পারে না। মা বকাঝকা করবেন। তাকে বিরক্ত করা যাবে না। মনের ভেতরে ঘুরপাক খায় কষ্টের কথাগুলো। অব্যক্ত কথারা তাকে খামচি দেয়। পীড়া দেয়। মনোবেদনায় জর্জরিত হয়। তবুও সে কিছুই বলতে পারে না। রাগ হলেও সে–রাগ নিজেকেই হজম করতে হয়। ঝাড়তে পারে না কারও উপর। না মায়ের উপর, না বাবার কাছে।
এই যখন অবস্থা হঠাৎ তার ভেতরে কে যেন কথা বলে ওঠে। ‘এই টুকি তুই কি একটু সাহসী হতে পারিস না! মনের কথাগুলো কি বলতে পারিস না? কায়দা করে বাবা–মাকে বল্।’
– ‘কিন্তু কীভাবে?’
‘কেন– তোর হাতে কলম আছে না! খাতাও তো আছে। টুক করে সব লিখে ফেল্ গল্পের মতো সুন্দর করে।’
নিজের সাথে নিজের অদ্ভুত কথা হয় টুকির। এখন সে অদৃশ্য কথনের শ্রুতলিপিকার। কলম হাতে লিখতে বসে। কিন্তু কী লিখবে টুকি? ভাবছে সে। তাকে ভালো না বাসার গল্প! নাকি কষ্টের কাহিনি! ভাবতে ভাবতে কিছু সময় গড়িয়ে যায়।
অতঃপর লেখার সূত্রপাত ঘটে। লেখার মাঝখানে আচমকা ঘটে যায় আরেক কাণ্ড। তার মনোযোগে ছেদ পড়ে অদূরে চেঁচামেচি শুনে। ব্যালকনিতে পাখির শোরগোল। কয়েকটি চড়ুই ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে এদিক–ওদিক ছুটছে। একে অপরকে ডাকছে, পাখা মেলছে, উড়ছে ছুটছে আরও কত কী। একেই কি বলে পাখির খেলা! নাকি দুষ্টামি!
দৌড়ে ব্যালকনিতে যায় টুকি। দূরত্ব বজায় রেখে পাখিদের খেলা দেখে। তার মন খুশিতে নেচে ওঠে। টুকিকে দেখে পাখিরা পালিয়ে যায় না। তারা তাদের মতো করে আনন্দে খেলছে। আর টুকি দেখছে। আহ কী সুন্দর! কী যে ভাল লাগছে টুকির! এ মুহূর্তে সেও যেন পাখি হয়ে যায়। সেও যেন পাখিদের সাথে খেলছে, উড়ছে, লাফাচ্ছে, ঠোঁটে ঠোঁট ঘষছে। পুতুলের নাকে যেমন সে নাক ঘষে ঠিক তেমনি করে। কতক্ষণ যে সময় বয়ে যায় টের পায়নি টুকি। হঠাৎ গুড়ুম করে অদূরে বৈশাখী বাজ পড়ল। ব্যালকনির গ্রিল, জানালা কেঁপে উঠল। পাখিগুলো চুপ মেরে গেল। ভয়ে টুকিও দৌড় দেয়। দুড়দাড় দৌড়ে যেতেই অঘটনটা ঘটে গেল। টেবিলের পাশের চেয়ারে পা লেগে হুমড়ি খেয়ে একেবারে শোকেসের কোনায় গিয়ে পড়ে। ‘মা–গো..ও.ও…’ বলে চিৎকার দিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে টুকি। চিৎকারটা ড্রইংরুম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মা ছুটে আসেন। দেখেন টুকি মেঝেতে লুটিয়ে আছে। কপাল থেকে লাল নদী বয়ে গেছে। বাঁকে বাঁকে ছুটে কানের কাছে এসে থমকে আছে। মা ঝাপটিয়ে কোলে তুলে নেয়। বুয়াকে ডাক পাড়ে। বুয়া বুয়া তাড়াতাড়ি পানি নিয়ে এসো। বুয়া জগ হাতে দৌড়ে আসে। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে রক্ত মুছে দেয়। ছড়কে যাওয়া ক্ষতে ওষুধ লাগায়, ব্যাণ্ডেজ করে। বুকে জড়িয়ে ধরে। আদর করে দুধ খাওয়ায়। বিছানায় শুইয়ে দেয়। হাত বুলিয়ে দেয় সারা গায়ে। টুকির তখন কী যে ভাল লাগে। ভাবে– ইস্, মা যদি প্রতিদিন এমন করে আদর করতো! তার সেই ছড়াটি মনে পড়ে যায়। ‘…পুতুলকে সে জড়িয়ে ধরে যেমন চুমু খায়/ তেমনি মায়ের উষ্ণ বুকের আদর পেতে চায়।’ এ মুহূর্তে টুকির চাওয়া যেন পূরণ করছে মা।
টুকিকে বিছানায় শুইয়ে মা খেলনাপাতি গুছাতে গিয়ে দেখে টেবিলে কলমচাপা খোলা খাতা। তাতে কী যেন লেখা। মা চোখ বুলায়। গল্পের মতো করে লেখা টুকির অসমাপ্ত আকুতি–
‘মা আমি তোমাকে ভালোবাসি।
বাবা তোমাকেও আমি ভালোবাসি।
একা একা খেলতে ভালো লাগে না।
তোমাদের সাথে খেলতে আর গল্প করতে আমার মন চায়। কিন্তু…’











