কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য পদে আকস্মিক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক ও হঠকারী আখ্যা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শাটডাউন কর্মসূচি পালন করা শিক্ষক–শিক্ষার্থী ও অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির সব ধরনের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি থমকে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গতকাল সকাল ৯টা ২০ মিনিট থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে জড়ো হতে শুরু করেন। মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে সেখানে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘দাবি মোদের একটাই, সায়েম স্যারকে ভিসি চাই’, ‘ভিসির চেয়ার কারে চায়, সায়েম স্যারকেই আবার চাই’, ‘ভিসি স্যার, ভিসি স্যার, সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’ ইত্যাদি স্লোগানে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত করে তোলেন। এছাড়া নতুন উপাচার্যের প্রবেশাধিকার রোধ করতে ভিসি কক্ষে তালা ঝুলিয়ে সেখানে হাতে লেখা নোটিশ সাঁটিয়ে দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন চুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ। মানববন্ধনে পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক বশির জিসান বলেন, চুয়েট ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে দেখিনি। এর কারণ, তিনি (বিদায়ী উপাচার্য) শিক্ষার্থীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। সরকার সবকিছু বিশ্লেষণ করেই তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। তাহলে উপাচার্যকে কেন আবার অপসারণ করা হলো? এর মাধ্যমে আমাদের শিক্ষকসমাজকে ছোট করা হয়েছে, চুয়েটকে ছোট করা হয়েছে।
স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান বলেন, উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ায় আমরা সংক্ষুব্ধ। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে কোনো উপাচার্য বা শিক্ষকের জন্য শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কার্যক্রম বিরল। সব যৌক্তিক দিক বিবেচনা করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাহলে ১ মাস ২২ দিনের মধ্যে কেন তাকে সরানো হলো, তার যৌক্তিক কারণ আমাদের দেখাতে হবে। তা না হলে আমরা আমাদের অবস্থানে দৃঢ় থাকব।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. আহসান উল্লাহ বলেন, সবকিছু ভালোভাবেই চলছিল। সদ্য সাবেক উপাচার্য ভালোভাবেই তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে তো সময় দিতে হবে। কিন্তু এভাবে অপসারণ মেনে নেওয়া যায় না। আমরা তার পুনর্বহাল চাই। শিক্ষার্থীরাও তাকে চান। মানববন্ধন সঞ্চালনা করেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রিদয় মাসুম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে চলমান এই অস্থিরতা নিরসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষার্থে এদিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জরুরি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম ও সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. মকবুল হোসেন স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, চুয়েটের উপাচার্য পদে নিয়োগ সংক্রান্ত ২১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে যে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সংরক্ষণ ও উন্নতির লক্ষ্যে উপাচার্য নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি পুনর্বিবেচনা করে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানানো হলো।
দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার ও সিফাত–এ নূর–সাবিহা। তারা বলেন, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে পারছেন না। আমাদের আপত্তি সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়, আমাদের আপত্তি হলো অধ্যাপক সায়েম স্যারকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো দৃশ্যমান ব্যাখ্যা ছাড়াই পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। আমরা জানতে চাই, উপাচার্যকে কেন অপসারণ করা হলো?
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আহনাফ শাহরিয়ার বলেন, আমরা উপাচার্য হিসেবে সায়েম স্যারকেই চাই। এই দাবিতে আমাদের আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, ল্যাব ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রেখে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি চলবে। তবে নিরাপত্তা শাখা ও মেডিকেল সেবা এ কর্মসূচির আওতামুক্ত থাকবে।
উল্লেখ্য, গত ২৭ জুলাই চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। ২১ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কুয়েটের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই আকস্মিক রদবদলের পরে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে অসন্তোষ ও আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে ফিরেছেন সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। দুপুরের দিকে কালো রঙের একটি প্রাইভেটকারে করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের এ সময় ‘সায়েম স্যার, সায়েম স্যার’ স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। সকালে ঢাকা থেকে বিমানে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান অধ্যাপক সায়েম। সেখান থেকে সরাসরি চুয়েট ক্যাম্পাসে যান।
চুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বললেন, অধ্যাপক সায়েম ক্যাম্পাসে এসেছেন এবং শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। তাদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহাল করতে হবে। শিক্ষক সমিতিও এ দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে। নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে আসার বিষয়ে প্রশাসনকে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে আজ বুধবার সকাল থেকে উপাচার্য ভবনের সামনে ব্যাচসহ সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে গণ অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চলবে। পাশাপাশি অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য হিসেবে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে না।












