সংসদের করিডরে একসময় প্রতিধ্বনিত হতো প্রয়াত সংসদ সদস্য সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের পদচারণা। সেই প্রতিধ্বনিই এবার ফিরছে তার মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানার পদচারণায়। বাবা বিএনপি’র ব্যানারে চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন হুইপও। এবার বিএনপি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় সাকিলাকে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত ৫০ আসনের মধ্যে বিএনপি’র জন্য বরাদ্দ ৩৬ আসন। গতকাল সাকিলা ফারজানাসহ ৩৬ জনকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। এর মধ্যে আছেন কঙবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এড. শামীম আরা স্বপ্না ও বান্দরবানের নারী নেত্রী এডভোকেট মাধবী মারমা। নির্বাচন কমিশন (ইসি)-এর ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী, আগামী ১২ মে জাতীয় সংসদের ৫০ টি সংরক্ষিত আসনের ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংসদ সদস্য হিসেবে পথচলায় সাকিলা ফারজানাসহ বাকি প্রার্থীদের জন্য ভোটগ্রহণ এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কারণ দল ও জোটের বরাদ্দ পাওয়া আসনের সমান প্রার্থী হলে ভোটেরও প্রয়োজন হয় না। জামায়াত জোটও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসনের জন্য প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ফলে মনোনয়নপত্র দাখিলসহ অন্যান্য নিয়মগুলো এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।
জানতে চাইলে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম–এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাকিলা ফারজানা আজাদীকে বলেন, দল আমাকে মূল্যায়ন করেছে সেজন্য আমি অনেক আনন্দিত এবং দলের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি আস্থা রেখে দেশ গড়ার পবিত্র দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিয়েছেন। তার এই বিশ্বাস আমার জন্য গর্বের, প্রেরণার এবং দায়বদ্ধতার এক অনন্য প্রতীক। তিনি বলেন,আমার প্রিয় হাটহাজারীবাসীর প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাই। তাদের আস্থা, ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণেই আজ আমি এই সম্মান অর্জন করতে পেরেছি। তাদের ছাড়া আমি সত্যিই শূন্য। আমার দুঃসময়ে রাজনৈতিকভাবে আমার অনুপস্থিতিতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাকে রাজনৈতিক সহযোগিতা করেছিলেন তারাসহ যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ আমি এতদূর পৌঁছাতে পেরেছি তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ। আমি সকলের কাছে দোয়া চাই। আমি শুধু ক্ষণিকের দোয়া প্রার্থী নই; আমি চাই আজীবন সবার ভালোবাসা ও দোয়ায় নিজেকে সমৃদ্ধ রাখতে। আমি তাদের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো।
জানা গেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম–৫ (হাটহাজারী) আসন থেবে সাকিলা ফারজানা বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাশ করে ইউনিভর্সিটি অব লন্ডন থেকে আবার এলএলবি সম্পন্ন করেন। এছাড়া লন্ডনের দ্য সিটি ল’ কলেজ থেকে পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। ২০০৯ সালে বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করে সক্রিয় হন রাজনীতিতে। ‘রাজননৈতিক মামলায়’ ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট গ্রেপ্তার হয়ে ১০ মাস ৮ দিন কারাভোগও করেন। বর্তমানে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম–এর কেন্দ্রীয় আহবায়ক কমিটির সদস্য তিনি।
বিএনপি’র ঘনিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে বিএনপি’র দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন ‘রাজনৈতিক মামলা’ উচ্চ আদালতে পরিচালনা করেন সাকিলা ফারজানা। ওই জায়গা থেকে দলের হাই–কমান্ডের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে তার। এছাড়া হাটহাজারী উপজেলায়ও দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন তিনি।
এদিকে চট্টগ্রাম থেকে সংরক্ষিত আসনের জন্য সাকিলা ফারজানাসহ ৩৬ নেত্রী দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। গত ১৮ এপ্রিল তাদের সাক্ষাৎকার নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি, আফরোজা বেগম, মোছাম্মৎ শাহেনেওয়াজ চৌধুরী, এস এম নুসরাত ইকবাল, নাছিমা আক্তার চৌধুরী, আইরীন পারভীন খন্দকার, ফরিদা আকতার, ডা. কামরুন নাহার, ড. নাছিমা ইসলাম চৌধুরী বৃষ্টি, রীনা আকতার, দিল আফরোজ সুলতানা চৌধুরী, নাজমা আকতার, জিনাতুন নেছা জিনু, ইয়াসমিন খান, ডা. লুসি খান, অ্যাডভোকেট হাসনা হেনা, আয়শা আকতার সানজি, সায়মা আহমেদ, নাসিমা সাফা কামাল, বিবি হাজেরা সাদাত আলম, জান্নাতুল নাঈম চৌধুরী রিকু, নাজনীন মাহমুদ, জেলী চৌধুরী, গোলতাজ বেগম, এডভোকেট কানিজ কাউসার চৌধুরী, মাহমুদা সুলতানা চৌং ঝর্ণা, ডা. ফারাহনাজ মাবুদ (সিলভী), নুরী আরা সাফা, মেহেরুন নেছা নার্গিস, ফারহানা ইয়াছমিন চৌধুরী আঁখি, মোছাম্মৎ সুলতানা বেগম (আঁখি সুলতানা), রৌশন আখতার, সুলতানা পারভীন, ডা. ফারহানা আফরোজ চৌধুরী ও জেসমিন খানম।
মনোনয়ন বঞ্চিত নগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি বলেন, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। বিএনপি একটি বড় দল, আসন সংখ্যা সীমিত। সুতরাং দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছেন সবার জন্য দোয়া ও শুভ কামনা রইল। আশা করছি তারা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্বে নিয়ে নিজেদের মেধা ও সৎততার সাথে কাজ করবেন।
উল্লেখ্য, তপশিল অনুযায়ি আগামী ১২ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত নির্বাচন ভবনে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২১ এপ্রিল (আজ) বিকেল চারটা। মনোনয়নপত্র বাছাই ২২ ও ২৩ এপ্রিল, আপিল আবেদনের সময় ২৬ এপ্রিল, আপিল নিষ্পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ২৯ এপ্রিল এবং প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল।
কঙবাজারে এডভোকেট স্বপ্না : আজাদীর কঙবাজার প্রতিনিধি জানান, ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে হাতেখড়ি কঙবাজারের নারী নেত্রী এড. শামীম আরা স্বপ্নার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির সম্মুখসারিতে ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পাট চুকিয়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হন। এরপর নিজ জেলা কক্সবাজারে ফিরে জড়িয়ে পড়েন মহিলা দলের রাজনীতিতে। নিজের দক্ষতা দেখিয়ে জেলা বিএনপির রাজনীতিতেও শক্ত জায়গা করে নেন। বর্তমানে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
এড. শামীম আরা স্বপ্না বলেন, এক আদর্শ আর এক নীতিতে অটল থেকে ধৈর্য্য আর সংগ্রামের পরিপূর্ণতা পেয়েছি আজ। এ জন্য দলের চেয়্যারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ দলের স্থায়ী কমিটির সব সম্মানিত সদস্যের কৃতজ্ঞতা জানাই। সংসদে গিয়ে এবার জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করবো।
জানা গেছে, এড. শামীম আরা স্বপ্না ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন, তখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ১৯৮৪ সালে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেণন। পর আইনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৮৬ সালে কঙবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে আইন পেশায় যোগ দেন। এরপর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে কঙবাজার জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওয়ান–ইলেভেন–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জেলা বিএনপির সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি কঙবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের দুর্দিনে সংগঠন পুনর্গঠন, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং তৃণমূলকে সক্রিয় রাখতেগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এড. শামীম আরা স্বপ্না। তার নেতৃত্বে কঙবাজার জেলা বিএনপি একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। সামনে আরো দক্ষতার সাথে তিনি দলের নেতাকর্মী ও জনগণের জন্য কাজ করে যাবেন বলে জানিয়েছেন।
বান্দরবানে এডভোকেট মাধবী : আজাদীর বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, এডভোকেট মাধবী মারমার বাড়ি বান্দরবান জেলা শহরের মধ্যম পাড়ায়। জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক মুজিবুর রশীদ বলেন, দলের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে মহিলা আসনে মনোনয়নের জন্য তালিকা পাঠানো হয়েছিল। দলের নীতি নির্ধারণরা যেটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি আমরা সাধুবাদ জানাই। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।














